ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তো পুঁজিবাদের চূড়ান্ত গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তো পুঁজিবাদের চূড়ান্ত গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল
×
×

অরুন্ধতী রায়

অরুন্ধতী রায়

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

এআই যেন সাহিত্যজগতে এক প্রবল ঝড়ের মতো আছড়ে পড়েছে। এর ফলে লেখক, প্রকাশক, সাহিত্যিক এজেন্ট, পাঠক, সমালোচক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী– সবাই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যেন তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। অধ্যাপকদের এখন শিক্ষার্থীদের জমা দেওয়া কাজের দিকে তাকাতে হচ্ছে সন্দেহের চোখে। প্রকাশকদের ঠিক গোয়েন্দাদের মতো নতুন লেখকদের মূল্যায়ন করতে হচ্ছে; যেন তারা কোনো সম্ভাব্য অপরাধের ঘটনাস্থল খুঁটিয়ে দেখছেন। পড়া বা শেখার প্রক্রিয়ার ওপর এর প্রভাব কেমন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আনন্দ ও চ্যালেঞ্জের জায়গাটি দখল করে নিয়েছে এক রুদ্ধ, বিষাক্ত ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটি যেন ট্যাক্সিডার্মিস্টদের (যারা মৃত প্রাণীর চামড়া ছাড়িয়ে ভেতরে খড় বা অন্য কিছু ভরে সেগুলো জীবন্তের মতো সাজিয়ে রাখে) এক কাল্পনিক স্বর্গ, যেখানে একসময়ের জীবন্ত সবকিছুকে চামড়া ছাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে; আর সেই উজ্জ্বল, নকল চোখগুলো একদৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন তাতে গভীর কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে! বিষয় অনেকটা এমন, কারও দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, সে কি সত্যিই সেই ব্যক্তি, যাকে আপনি তেমনটা মনে করছেন? অথবা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বুঝতে পারছেন– এটি আপনি নিজে নন।

সময়ের সঙ্গে হয়তো আমরা সেই বোধটুকুও হারিয়ে ফেলব। তখন আর জানব না– আমরা কে; এমনকি আমাদের অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা।

আর যখন এমন পরিস্থিতি পুরো সমাজ বা পুরো মানবজাতির ক্ষেত্রে ঘটে; যখন আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী অর্জিত ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর ওপর আর ভরসা করতে পারি না; যখন আমরা আমাদের হৃদয়, চোখ বা কানের ওপর আস্থা রাখতে পারি না; যখন সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কিংবা ভার্চুয়াল ও বাস্তব জগতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না; যখন সময় তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়; যখন লাখ লাখ ভাষা ও সংস্কৃতি মিশে একাকার হয়ে অস্পষ্ট কোনো পিণ্ডে পরিণত হয়; যখন প্রাচীন সামাজিক চুক্তি; তাতে যতই সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি থাকুক না কেন– সম্পূর্ণরূপে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন কি আমরা নিজেদের এক ব্যাপক মানসিক বিকৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছি না?

এ ধরনের চিন্তাভাবনার কারণে হয়তো আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে– আমি এক অনিবার্য ‘নৈতিক আতঙ্ক’র শিকার হয়েছি, যা সাধারণত নতুন ও দুর্বোধ্য কোনো কিছুর মুখোমুখি হলে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়। শিল্পবিপ্লব বা কম্পিউটারের আগমনের আগেও ঠিক এমন আতঙ্কই দেখা দিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, বিষয়টি কি কেবল এটুকুই? আমরা কি মানবজাতির ‘অগ্রগতির’ বিবর্তনে কেবল একটি অস্বস্তিকর ক্রান্তিকাল পার করছি? নাকি এটি প্রকৃতপক্ষে এক বিপর্যয়কর বিচ্ছেদ বা ভাঙন?

গত মাসে ‘অ্যানথ্রোপিক’ নামক প্রতিষ্ঠানের এক তরুণ কর্মী জ্যাকব কক্সন তাঁর চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি জানান, তাঁর বিবেক তাঁকে এমন কোনো প্রকল্পে কাজ করার অনুমতি দিচ্ছে না, যা মানবজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর কর্মক্ষেত্র অনেকটা যেন ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’-এর (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির একটি গোপন গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচি) এক অতি উন্নত ও ভয়াবহ সংস্করণ। 

তবে কক্সনের পদত্যাগ-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ছিল বিভ্রান্তিকর। এআই নিয়ে কাজ করা বড় কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা যেন একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা তথ্য ফাঁসকারীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করলেন। কেউ দ্বিমত পোষণ করলেন, কেউবা একমত হলেন। তারা অত্যন্ত গম্ভীর ও বিষণ্ন কণ্ঠে আমাদের জানালেন, তারা যে ‘মেশিন ঈশ্বর’ তৈরির প্রক্রিয়ায় লিপ্ত, তা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে মানবজাতির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর তারা আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে, এই ঝুঁকি কমানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। তারা সরকারি নিয়ন্ত্রণের (রেগুলেশন) জন্য আবেদন জানালেন। তাদের এই সাহায্যের আকুতিতে যেন এক ধরনের বিকৃতি বা অসুস্থ মানসিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়– বিষয়টির মধ্যে এক অদ্ভুত ‘বাঁধো আমায়, আটকে ফেলো আমায়!’ ধরনের প্রবণতা রয়েছে। এটি কি কোনো বিকৃতি, নাকি পুঁজিবাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য? লাগামহীন লোভের সামনে এক অসহায় আত্মসমর্পণ?

এই ধনিক শ্রেণি সম্ভবত নিজেদেরই তৈরি করা ‘মানব বিলুপ্তির’ বয়ানে বিশ্বাস করেন– অন্তত এতটাই যে, তারা পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে বাঙ্কার তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে পানি, খাবার ও গোলাবারুদ মজুত আছে। তবে তারা আমাদের বাকিদের কাছে বিলুপ্তির কথা বিক্রি করছে না। (ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রযুক্তি-উদারবাদী, যাদের ‘টেক লিবারটারিয়ান’ বলা হয়, তারা খোলাখুলিভাবেই একে একটি ধাপ্পাবাজি বলে অভিহিত করেন।) তাদের প্রচারণার মূল উপজীব্য হলো উন্নতি, গৌরব এবং মানবজাতির কল্যাণ। এদেরই একজন প্যালানটির-এর পিটার থিল, সমালোচকদের এবং যারা (এআই) নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন, তাদের সরাসরি ‘অ্যান্টি-ক্রাইস্ট’ বা খ্রিষ্টবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন; তাঁর মতে, তারা যেন শয়তানের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। আর পরোক্ষভাবে তিনি তাঁর নিজের কোম্পানি এবং তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই যেন এক ধরনের ‘দেবত্ব’ প্রদান করছেন। 

কৌতূহলজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি-অলিগার্করা যেন শুধু জ্যাকব কক্সনের মতো হুইসেলব্লোয়ারদেরই সঙ্গে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ২০১৯ সালে গুগল থেকে পদত্যাগকারী মেরেডিথ হুইটেকারের, যিনি বর্তমানে সিগন্যাল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট– পক্ষে তারা দাঁড়াননি। তিনি গুগলের এমন একটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন, যার আওতায় মার্কিন ড্রোনের জন্য ‘মেশিন ভিশন’ প্রযুক্তি তৈরির কথা ছিল। সাত বছর পর এআই শিল্প এবং অস্ত্র শিল্পের সেই মেলবন্ধন আজ আমাদের সবার চোখের সামনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডাবল-ট্যাপ’ (পরপর দুবার) হামলার কথা মনে আছে নিশ্চয়, যেখানে ১২০ স্কুলছাত্রীসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হয়েছিল। এ জন্য কেউ ক্ষমা চায়নি। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে এর দায় নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। যন্ত্রের মাধ্যমে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অপরাধবোধের কোনো স্থান থাকে না।)

২০২০ সালে সিলিকন ভ্যালির উচ্চতর কারিগরি পদে থাকা হাতেগোনা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের একজন টিমনিট গেব্রুকে গুগল থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর অপরাধ, তিনি নিজের সহ-রচিত একটি গবেষণাপত্র সরিয়ে ফেলতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই গবেষণাপত্রে বড় আকারের ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম), যার মধ্যে গুগলের মডেলও অন্তর্ভুক্ত– প্রশিক্ষণের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। পাশাপাশি দেখানো হয়েছিল, কীভাবে এই মডেলগুলো তাদের বিশাল ডেটাসেট থেকে শুষে নেওয়া শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও নারী বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং পুনরুৎপাদন করে। তাঁর সতর্কবাণী ছিল, মডেলগুলোর পরিধি যত বাড়বে এবং সেগুলো নিরীক্ষা করা যত কঠিন হয়ে উঠবে, এই ক্ষতিকর প্রবণতাগুলো ততই তীব্রতর হবে। 

হুইটেকার ও গেব্রু এবং তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো কেন জেফ্রি হিন্টন (এআই বিজ্ঞানী থেকে সমালোচকে পরিণত ব্যক্তি) বা জ্যাকব কক্সনের মতো, যারা মানবজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাদের তুলনায় অলিগার্কদের (মুষ্টিমেয় অতি-ধনী প্রভাবশালী ব্যক্তি) বেশি উদ্বিগ্ন করে না? সম্ভবত এর কারণ হলো, হিন্টন বা কক্সনের সতর্কবার্তাগুলো অনেকটা বড় কোনো আতশবাজি প্রদর্শনী বা উৎসবের আমেজ তৈরি করার মতো, যা কেবল উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত এগুলো অলিগার্কদের ক্ষমতার খেলাকেই আরও জোরদার করে। অদূর ভবিষ্যতে যখন তাদের কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে, তখন এই পরিস্থিতি তাদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক প্রমাণিত হবে। কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য নির্ভর করবে তাদের মডেলগুলো কতটা উন্নত আর এআই অস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কতটা প্রাণঘাতী, তার ওপর।

দুই.
মহাপ্রলয় বা ‘অ্যাপোক্যালিপস’ এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানাবিধ দুর্দশার বেশ কয়েকটি রূপ রয়েছে, যার মুখোমুখি আজ মানুষকে হতে হচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো প্রজাতি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আতঙ্কজনক বয়ান। আরেকটি সংস্করণ হলো এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান কোনো প্রজাতি আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। (এর পরিণতি কী হতে পারে তা বোঝার জন্য ভেবে দেখুন, এই গ্রহে আমাদের সঙ্গে বসবাসকারী অন্যান্য প্রজাতির ওপর আমরা কী ধরনের আচরণ করেছি, তা বিবেচনা করলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াকেও বরং অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে!)
আমাদের স্লোগান কী হওয়া উচিত? ‘চরম কঠোরতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করো’? হতে পারে। যদিও সত্যি বলতে, এর অর্থ কী বা বাস্তবে এটি কেমন দেখাবে, আমার জানা নেই।

পরিস্থিতি অনেকটা ২০০৪ সালের সুনামির ঠিক আগের মুহূর্তের মতো। থাইল্যান্ড আর ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্রের জল উপকূল থেকে পিছিয়ে গেলে মানুষ অবাক হয়ে নতুন জেগে ওঠা বিশাল সৈকত দেখতে ছুটে গিয়েছিল। তারা বুঝতেও পারেনি, সমুদ্রের অনেক গভীরে তখন বিশাল এক জলরাশি তৈরি হচ্ছে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে। 

ঝকঝকে বালুকাবেলায় ছড়িয়ে থাকা লোভনীয় সব টুকরো জিনিস আমাদের সমুদ্রের আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে রয়েছে জাদুকরী সব সম্পদ, রত্নখচিত ঝিনুক আর গোপন দুর্গ। এদের কুৎসিত নাম হলো ‘কনজিউমার অ্যাপ্লিকেশন’ বা ভোক্তাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি। এগুলো আপনার মা, প্রেমিক, থেরাপিস্ট বা ডাক্তার; সবই হতে পারে। এগুলো আপনার পছন্দের শৈলীতে মুহূর্তের মধ্যে উপন্যাস লিখে দিতে পারে, আবার যে কোনো ভাষায় অনুবাদও করে দিতে পারে। এগুলো আপনার সিনেমার সম্পাদনা, সুর সৃষ্টি, গবেষণার কাজ করতে পারে। এমনকি আইনি নথিপত্রও তৈরি করে দিতে পারে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এদের অবদান তো এক অলৌকিক ঘটনার মতোই। (অবশ্য এর ফলে দরিদ্র মানুষ যে কলেরা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা অথবা নিছক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে মারা যাচ্ছে, তা কিন্তু থামবে না।) এ ছাড়া এগুলো আপনার ফোনের মাধ্যমেই তাৎক্ষণিক বিচার, শিক্ষা আর গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। আর যদি আপনার ঝোঁক অন্যদিকে থাকে, তবে এগুলো আপনার নাৎসি স্যালুটকে আরও নিখুঁত করে তুলতে পারে। এমনকি আপনার হাতে তুলে দিতে পারে মানসিক এক ‘চেইন-স’ (করাত)। এমন কিছুকে ভালো না বেসে উপায় কী? 

এআই এবং কর্তৃত্ববাদ নিয়ে এত আলোচনার মাঝেও কি এটি সত্য নয়, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ও সেরা ফ্যাসিবাদবিরোধী ইউটিউবার এবং অক্লান্ত কর্মীরা, বিশেষ করে ভারতে, যাদের সম্মিলিত গ্রাহকসংখ্যা কয়েক কোটি, তারাই আবার এআইর কট্টর সমর্থক? কিংবা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘জেন-জি’ প্রজন্মের সেই ‘আরশোলা’ বিদ্রোহ, যা তৃষ্ণার্ত মাটিতে যেন বৃষ্টির মতো নেমে এসেছিল, তা কি দারুণ সব কৌতুকপূর্ণ ও প্রথা ভাঙা এআই ভিডিওর মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়েনি?

তিন.
আমি এমন লাখ লাখ লেখকের একজন, যাদের বই অ্যানথ্রোপিক তাদের এলএলএম বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রশিক্ষণের কাজে অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করেছে। একটি গণমামলার অংশ হিসেবে আমাকে একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যেখানে সমঝোতার প্রস্তাব হিসেবে প্রতিটি বইয়ের জন্য কয়েক হাজার ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বইগুলো লিখতে আমার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং কয়েক বছরের কঠোর পরিশ্রম ব্যয় হয়েছে। তারা আমাকে একটি ক্লেম নম্বর ও পিন কোড দিয়েছে। বিষয়টি অনেকটা আমার অজান্তে আমার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার মতো। এখন যেহেতু আমার কাজের ওপর ভিত্তি করে এই মেশিনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছে– শিগগিরই, যখন আমি আমার নিজস্ব শৈলীতে লিখব। যে ভাষাকে আমি কয়েক দশক ধরে কঠোর পরিশ্রমে একান্তই আমার করে তুলেছি। তখন হয়তো আমাকে বলা হবে, এটি আমার লেখা বলে মনে হচ্ছে না। বরং এটি আসলে এআইর সৃষ্টি। এখন আমি আমার বাকি জীবন কী করব? নিজের লেখার ধরন এড়িয়ে চলব? নতুন কোনো ভাষা খুঁজে নেব? 

আমাদের মধ্যে যারা ভিন্ন এক পৃথিবীতে জীবন কাটিয়েছি, তারা জানি– আমরা কী হারাচ্ছি। কিন্তু যে প্রজন্ম এখন বড় হয়ে উঠছে, তাদের কী হবে? তাদের কি নিজস্ব কোনো ভাষা, নিজস্ব চিন্তা বা নিজস্ব দুঃখবোধ থাকবে? তাদের কি অধিকার থাকবে সংগ্রাম করার? হোঁচট খাওয়ার? ব্যর্থ হওয়ার? অসম্পূর্ণ থাকার? তারা কি কখনও অনুভব করতে পারবে সেই তীব্র যন্ত্রণা আর পরম আনন্দ, যা পাওয়া যায় একটি জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করলে কিংবা নিজস্ব কোনো শিল্পকর্ম, সাহিত্য বা সংগীত সৃষ্টি করলে? ত্রুটিপূর্ণ হলেও? এআইর জয় হবে মানবসত্তার বিরুদ্ধে এক অপরাধ। এটি আমাদের মস্তিষ্ককে ফরমালডিহাইডে ডুবিয়ে বন্দি করে ফেলবে। আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীকে এটি ধ্বংস করে দেবে। যারা এর প্রচার চালায় এবং এখান থেকে মুনাফা অর্জন করে, তারা বিষয়টি জানে; এমনকি তারা অন্য কোনো জগতে সরে যাওয়ার ব্যবস্থাও করে ফেলেছে।

মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণি (অলিগার্করা) অত্যন্ত উচ্চস্বরে ও গর্বের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এটি যেন আমাদের বনাম তাদের লড়াই। তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইঙ্গিত দিচ্ছে– ‘সাইক্লোপস’ বা দানবীয় প্রযুক্তির বিকাশের জন্য মানবজাতিকে হয়তো বিলুপ্ত হতে হবে। নতুন প্রজন্ম, যারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, তারা বিষয়টি বোঝে। এই রচনার শুরুর দিকে আমি বলেছিলাম, আমাদের উচিত এদের ওপর ‘কঠোরতম নিয়ন্ত্রণ’ আরোপ করা। তবে এই এআই কোম্পানিগুলোর বিষয়ে আমি আসলে যা বলতে চাই তা হলো: এদের অস্তিত্বই পুরোপুরি নির্মূল করে দেওয়া প্রয়োজন।

লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ইকুয়েটর থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×