অর্থনীতি
কর দেবেন সবাই, জবাবদিহি করবে রাষ্ট্র
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মার্কেটিংয়ের একনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণে আমার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কোন বিজ্ঞাপন কীভাবে কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে এবং সহজে কোনো প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, তা আমাকে আগ্রহী করে। বেশ কিছুদিন আগে গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপন মুগ্ধ করেছিল, যেখানে মা ও সন্তানের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। আরসি-কোলার বিজ্ঞাপনও ভালো লেগেছে এর পেছনের সংগীত ও উপস্থাপনার কারণে। বাংলালিংকের একটি বিজ্ঞাপনে একজন জেলে মোবাইল ফোনে সঠিক তথ্য পেয়ে কীভাবে ক্ষমতায়িত হন, সেটিও মনে গভীর দাগ কেটেছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি বিজ্ঞাপন আমাকে ভিন্নভাবে ভাবিয়েছে। সেখানে একটি শিশুকে সরলভাবে বাবাকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, ‘বাবা, আয়কর কী? তুমিও কি আয়কর দাও?’
বিজ্ঞাপনটি খুব বেশি দিন প্রচারিত হতে দেখিনি। সরকারি সংস্থাটির বাজেট সংকট এর কারণ হতে পারে। আবার করদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনটির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করা হয়নি, এমনটিও হতে পারে। তবে বিজ্ঞাপনটি আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এর মধ্যে সমাজে কর দেওয়ার মানসিকতা, সচেতনতার অভাব এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের ঘাটতির প্রতিফলন রয়েছে। আমরা অনেকেই কর দিতে চাই না। বিশেষ করে শিক্ষিত ও সমাজের অধিকতর সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষণীয়।
বাংলাদেশের মানুষ যে কর দিতে অনাগ্রহী, তা বিস্ময়কর নয়। পৃথিবীর কোথাও কর দেওয়া মানুষের কাছে বিশেষ আনন্দের বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের কাছাকাছি, যা তুলনীয় অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রত্যক্ষ কর, বিশেষত আয়করের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিপুলসংখ্যক মানুষ করের আওতায় নেই, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আয় গোপন করে কর ফাঁকি দেন। অনেকে আয়কর আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা কর নির্ধারণের ফরম পূরণের জটিলতাকে নিজেদের অজুহাত হিসেবে তুলে ধরেন। অথচ কর ফাঁকি রোধে আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা ও সামাজিক অবস্থানও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
কর না দেওয়ার পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তি হলো, রাষ্ট্র নাগরিকদের পর্যাপ্ত সেবা দেয় না। তাই আগে সেবা নিশ্চিত হোক, তারপর কর দেওয়া যাবে। আরেকটি যুক্তি হলো, সমাজে যখন বড় ধরনের দুর্নীতি চলছে এবং প্রভাবশালীরা কর না দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছেন, তখন সামান্য কর ফাঁকি এমন কী অপরাধ! দুটি যুক্তিই আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। রাষ্ট্রের কাছে উন্নত সেবা দাবি করা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু সেবা নিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। একইভাবে বড় দুর্নীতির অস্তিত্ব ছোট দুর্নীতিকে বৈধতা দেয় না। দুর্নীতি যে মাত্রারই হোক, তা নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়; অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অবশ্য কর না দেওয়ার পেছনে কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। কর প্রশাসনে দুর্নীতি, জটিল আইন, হয়রানি এবং সৎ করদাতাদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ কর দেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এসব সমস্যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং কর ব্যবস্থা সহজ, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে হবে। তবে প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করার দাবি তোলার পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্বও পালন করতে হবে। এক পক্ষের ব্যর্থতা অন্য পক্ষের আইন অমান্য করার অজুহাত হতে পারে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশি সহায়তা, অনুদান ও বিনিয়োগের ভূমিকা থাকলেও দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে নিজস্ব সম্পদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়লে সরকার নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বিদেশি অর্থায়নের শর্তের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। যথাযথভাবে সম্পদ বরাদ্দ করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদার করাও সম্ভব।
কর পরিশোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। যখন করদাতার সংখ্যা সীমিত থাকে এবং কর প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়, তখন নাগরিক ও সরকারের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করার মাত্রা বাড়ে। অথচ করদাতার সংখ্যা বাড়লে সরকারি ব্যয়, বার্ষিক বাজেট এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হতে পারে। নিয়মিত কর দেওয়া নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি তুলতে পারেন। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের দায়িত্ব হবে কর ফাঁকিদাতাদের শনাক্ত এবং আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। এতে সৎ করদাতারা অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা পাবেন এবং কালো টাকার প্রভাব কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে কর রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘ মেয়াদে অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে কর রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় চার লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে রাজস্বের এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্কের মতো পরোক্ষ কর থেকে। প্রত্যক্ষ করের আওতা ও অবদান আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যাদের আয় ও সম্পদ উল্লেখযোগ্য, তাদের কর পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার মধ্যে দৃশ্যমান অসংগতি থাকলেও তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সমাজ চাইলে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রথমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে প্রকৃত আয় প্রকাশ করে আইন অনুযায়ী কর দিতে হবে। পাকিস্তানেও ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর বিবরণী দাখিল ও কর পরিশোধে বাধ্য করতে সময়সীমা নির্ধারণ এবং শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়ার নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও আইন প্রয়োগে প্রভাবশালী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক কিংবা অনিয়মকারী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে আয় গোপন করে কর ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে একইভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
‘জনগণের সরকার, জনগণের জন্য সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার’– এই ধারণায় সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসী হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেই দায়িত্ব সরকারের, আবার রাজস্ব জোগানোর দায়িত্ব নাগরিকেরও। আমরা যদি নিজেরাই দায়িত্ব পালন না করি, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে উন্নত সেবা ও সুশাসন দাবি করার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে কর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কারণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; নাগরিক হিসেবে আমাদেরও প্রশ্ন করা প্রয়োজন– আমরা যদি কর না দিই মা, কেমনে সকাল হবে?
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার
- বিষয় :
- মামুন রশীদ