ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

চারদিক

সবুজের হাতছানিতে বিষাদের ছায়া!

সবুজের হাতছানিতে বিষাদের ছায়া!
×
×

রুমানা আক্তার

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১০

মেঘ-পাহাড়ের মিতালি, সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি নদী ও ঝর্ণার রিমঝিম শব্দ বান্দরবানের বাস্তবতা। প্রকৃতির রূপসীকন্যা বান্দরবান প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষকে। দেবতাখুমের রহস্যময় পরিবেশ, নাফাখুমের গর্জন কিংবা কেওক্রাডং ও বগালেকের শান্ত সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান এই পাহাড়ি জেলায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ মেঘের উপত্যকাই হয়ে উঠছে অনেকের জন্য বিষাদের নাম। পাহাড়ি ঝর্ণা, নদী ও পাহাড়ি খাদে একের পর এক পর্যটকের প্রাণহানির খবর এখন প্রায়ই শোনা যায়। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো এবং বান্দরবানকে পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার সময় এখনই। এ নিয়ে বর্তমানে সচেতন নাগরিক সমাজ এবং জনপ্রতিনিধিরাও কাজ করছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ৯ বছরে বান্দরবানে ঘুরতে এসে ২৬ জন পর্যটকের অপমৃত্যু ঘটেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি পাহাড়ি ঢল, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীতে ডুবে যাওয়া এবং রোয়াংছড়ি, থানচি ও আলীকদমের দুর্গম পাহাড়ি সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জিপ, চাঁদের গাড়ি বা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একাধিক পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।

বিপদের এই মাত্রা কমাতে হলে সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক নজরদারি, নিবন্ধিত গাইড নেওয়া এবং লাইফ জ্যাকেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বান্দরবানকে নিরাপদ করতে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সচেতনতা, প্রশানসিক কঠোরতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। 

দেবতাখুম এবং নাফাখুম বান্দরবানের রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার দুটি পর্যটন স্পট। এগুলোয় পৌঁছাতে বাঁশের ভেলা বা ট্র্যাকিং করতে হয়। বর্ষাকালে এখানে আচমকা পাহাড়ি ঢল আসে এবং ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়। পানির নিচে লুকিয়ে থাকা পিচ্ছিল পাথর এবং প্রাক্কলিত গভীরতা না বুঝে নামার কারণে এখানে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনার হার বেশি। অন্যদিকে রুমা থেকে বগালেক ও কেওক্রাডং যাওয়ার চাঁদের গাড়ি (জিপ) ও মোটরসাইকেলের পথ অত্যন্ত খাড়া ও বিপজ্জনক। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে জিপ রোডের পিচ্ছিল কাদা ও পাহাড়ি খাদে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

খুম ও ঝর্ণাগুলোয় বর্ষাকালে সেকেন্ডের মধ্যে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে, যা দূর থেকে বোঝা অসম্ভব। সাঁতার না জানা সত্ত্বেও প্রটেক্টিভ গিয়ার বা লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা এবং ট্র্যাকিংয়ের নিয়ম না মানার কারণে বিপদ ঘটে। তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০ জন পর্যটকের জন্য একজন নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ট্যুর এজেন্সি বা দল বাণিজ্যিক মুনাফার জন্য এক গাইড দিয়ে বড় দল পরিচালনা করে পর্যটকদের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। থুইসাপাড়া, নাফাখুম বা দেবতাখুমের মতো অতি দুর্গম এলাকায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার বা প্রাথমিক চিকিৎসার আধুনিক কোনো ব্যবস্থা না থাকা মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

সুরক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন, পর্যটন পুলিশ ও পর্যটকদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সে জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা দরকার। বিশেষ করে গভীর পানি বা ঝুঁকিপূর্ণ ট্র্যাকিং জোনগুলোয় লাইফ জ্যাকেট ও হেলমেট নিশ্চিত করা এবং গাইডের নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করা আবশ্যক। এ ছাড়া নিবন্ধিত গাইডদের সাধারণ নির্দেশনার পাশাপাশি ‘ফার্স্ট এইড’ এবং ওয়াটার রেস্কিউ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। খুম ও ঝর্ণাগুলোর বিপজ্জনক স্থানে স্থায়ী লাল পতাকা ও স্পষ্ট সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা অত্যাশ্যক।

অনেকেই চিন্তা করেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভাষা বা যোগাযোগ দক্ষতা না থাকায় চাঁদাবাজি বা কোনো সহিংসতার স্বীকার হতে হয়। কখনও কখনও ভাড়ার টাকা অতিরিক্ত নেয় পর্যটকদের কাছ থেকে। এ ক্ষেত্রে নজরদারি প্রয়োজন। বান্দরবানে পর্যটকদের সুরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে পারলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ইকোট্যুরিজম হাব হতে পারে।

রুমানা আক্তার: শিক্ষার্থী, বান্দরবান 

আরও পড়ুন

×