চারদিক
পরিবেশ আইনের দ্বিমুখী নীতি
মো. আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং এর অধীনে ঘোষিত ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ কাঠামোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর-খুলনা জেলা কার্যালয় কর্তৃক বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (২০১০ সালে সংশোধিত) এবং ইসিএ বিধিমালার আওতায় সুন্দরবন-সংলগ্ন ১৮টি রিসোর্টের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের সব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাংমারী নদীতীরবর্তী লোকালয়ে নির্মিত এসব রিসোর্টের মধ্যে পূর্বে শোকজপ্রাপ্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিন এবং নতুন করে তৈরি হওয়া ৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
বৃহত্তর সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে মোট ২৪টি ইকো-রিসোর্ট চিহ্নিত হলেও প্রশাসনিক এখতিয়ারের কারণে খুলনা জেলার আওতাধীন ১৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব প্রতিষ্ঠান ইসিএ অঞ্চলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ করেনি এবং ইতোপূর্বে পেশ করা অনুমোদনের আবেদনগুলো প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে বাতিল করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে– নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্বপ্রণোদিতভাবে সম্পন্ন না করা হলে নিয়মিত মামলা দায়ের, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৮টি ইকো-রিসোর্ট বন্ধ এবং তাদের অবকাঠামো অপসারণের জারি করা নির্দেশ পর্যটন খাত, স্থানীয় সমাজ-অর্থনীতি এবং পরিবেশগত প্রশাসনের নীতি-প্রয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সংকটজনক পরিবেশ সুরক্ষার আইনি বিধানে সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় যে কোনো ধরনের স্থায়ী পাকা অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও সেখানে প্রতিনিয়ত শত শত বহুতল কংক্রিটের হোটেল, ফাইভস্টার রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব স্থানে ক্ষেত্রবিশেষে আংশিক জরিমানা বা পর্যবেক্ষণ চালুর মধ্যে প্রশাসনিক আইনি পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে দেওয়া হয়। বিপরীতক্রমে সুন্দরবনের প্রান্তিক লোকালয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব ছোট কটেজগুলোর ক্ষেত্রে সংশোধন বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি উচ্ছেদ আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
সুন্দরবন-সংলগ্ন রিসোর্ট বন্ধের এই ঘটনা দেশে টেকসই সবুজ পর্যটন খাতের নীতিগত শূন্যতাকে স্পষ্ট করে। পর্যটন শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার সরকারি জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০১০ এর অনুশাসনের সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের প্রয়োগের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। উদ্যোক্তারা স্থানীয় ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, সরকারি ফি প্রদান, আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধ এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন করে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরে পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে গেলে জানানো হয়, ইসিএ এলাকায় ছাড়পত্র প্রদানের প্রশাসনিক বিধান নেই। ছাড়পত্র না পাওয়ায় জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া আটকে যায়, অথচ পরে ছাড়পত্র না থাকার কারণ দেখিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার এই ধরন বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরিবেশ আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃতির বিনাশ রোধ; একই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষতি না করে পরিচালিত সবুজ অর্থনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। সুন্দরবনের সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য মৌলিক অগ্রাধিকার। তবে নীতিগত স্পষ্টতার অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কক্সবাজারের তুলনায় সুন্দরবন অঞ্চলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ পর্যটন শিল্প ও সবুজ বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করে।
মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ,
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- চারদিক