ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

মানবাধিকার

পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার বিচার

পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যার বিচার
×
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৪২

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা নিছক কোনো ব্যক্তির অপরাধ কিংবা বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সম্প্রতি সিলেটের রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, এই রায় একটি নির্মম মৃত্যুর বিচারিক পরিণতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনের কার্যকারিতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। 

২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। একজন মানুষকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রেখে এভাবে নির্যাতন করা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণহানি আমাদের আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যায় না। অভিযোগের তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করাই পুলিশের দায়িত্ব। কাউকে নির্যাতন করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার নেই।

রায়হান আহমদের ঘটনার একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মামলাটি দায়ের এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সিলেট মহানগর পুলিশের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। তবে একটি মামলায় বিচারিক রায় হওয়া আর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। ঢাকার পল্লবী থানা হেফাজতে ইশতিয়াক হোসেন জনির মৃত্যুর ঘটনায় ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের অধীনে প্রথম বিচারিক রায় আসে। রায়হান আহমদের মামলার রায় সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দৃষ্টান্ত। ২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়নের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই আইনের অধীনে বিচারিক প্রতিকারের দৃষ্টান্ত মাত্র দুটি। অথচ এ সময়ের মধ্যে দেশে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। ২০১৩ সাল থেকে হিসাব করলেও এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা কয়েকশ হতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এতগুলো ঘটনার পরও বিচারিক জবাবদিহির পরিসর এত সীমিত কেন?

২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়ন ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কোনো আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, যদি তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত না হয়। আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে অপরাধের অভিযোগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে; প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে কিনা; ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কিনা এবং শেষ পর্যন্ত দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তার ওপর।

হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অভিযোগের সঙ্গে অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য বা কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত থাকেন। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পায়। হেফাজতে থাকা ব্যক্তির ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, হেফাজতের রেজিস্টার, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি। এসব আলামত নষ্ট বা গোপন করা হলে ন্যায়বিচারের পথ সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে অভিযোগকারী পরিবার ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি, হয়রানি ও চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। তদন্তের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপর কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ যেন কাজ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এখানে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। হেফাজতে নির্যাতন কি কেবল কয়েকজন অসাধু পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধ, নাকি এর পেছনে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি রয়েছে, যা এ ধরনের অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি করে? বিষয়কে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রশিক্ষণ, জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি, হেফাজত ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া– সবকিছুই পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নির্যাতনকে অপরাধের তদন্ত বা তথ্য আদায়ের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্য শুধু আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নয়; মানবাধিকার ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারও জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া কিংবা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক থাকার কারণে কোনো ব্যক্তির মৌলিক অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না। সংবিধান প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় কিংবা কথিত অপরাধের শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই তার এখতিয়ার নয়। বিচার করার ক্ষমতা আদালতের; আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নেই।

রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়; সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। তাই রায়হান আহমদের মামলায় বিচারিক রায়কে প্রকৃত অর্থে সার্থক করতে হলে এর শিক্ষা ও তাৎপর্যকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দিতে হবে। বিচার শুধু অতীতের অপরাধের প্রতিকার নয়; ভবিষ্যতের অপরাধ প্রতিরোধেরও অন্যতম শর্ত। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×