তৃতীয় মেরু
গঙ্গা চুক্তি নবায়নে বিহারের হঠাৎ বাগড়ার কারণ
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৩
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী গঙ্গার পানিতে ‘বিহারের ন্যায্য অধিকার’ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। শুক্রবার রাজধানী পাটনায় খোদ রাজ্য সরকার আয়োজিত ‘গঙ্গার পানি চুক্তি: বিহারের পানি নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি আরও বলেছেন, ‘বিহারের জন্য পানীয় হিসেবে, সেচ কাজে ও শিল্প খাতে পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন, বিশেষত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বিষয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ (দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩১ অক্টোবর ২০২৬)।
আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ বা একই দেশের ভাটির রাজ্য থেকে ‘ন্যায্য অধিকার’ চাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। খোদ ভারতেও বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। কিন্তু সবই উচ্চারিত হয় উজানের দেশ বা রাজ্যকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম উজানের কোনো দেশ বা রাজ্য ‘পানির ন্যায্য অধিকার’ চাইছে ভাটির রাজ্য বা দেশকে লক্ষ্য করে!
বিহারে গঙ্গার পানি আসে উত্তরাখণ্ড রাজ্য বা উত্তরপ্রদেশ হয়ে। ওই দুই রাজ্যে নদীটি ঘিরে ড্যাম, এমনকি ব্যারাজও কম নেই। যেমন উত্তরপ্রদেশের কানপুরে রয়েছে লব-কুশ ব্যারাজ এবং উত্তরাখণ্ড রাজ্যের হরিদ্বারে রয়েছে ভিমগোদা ব্যারাজ। ওই দুই রাজ্যের ভাটিতে অবস্থিত বিহার থেকে যদি পানির ন্যায্য হিস্যা চাইতেই হয়, তাহলে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ উজানের ব্যারাজ দুটির কথা তুলত। তার বদলে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী ভাটিতে অবস্থিত ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা চাইছেন! গঙ্গাকে তাহলে তো উজান বাইতে হবে!
সন্দেহ নেই, গঙ্গা ভারতের যে পাঁচটি রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেগুলোর মতো বিহারের জন্যও নদীটি আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির সময় বিহার যতটা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ছিল; ৩০ বছর মেয়াদ শেষে যেন ততটাই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি যাতে নবায়ন না হয়, এর বিরুদ্ধে রীতিমতো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে রাজ্যটিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি-জেডিইউ জোট। প্রশ্ন হচ্ছে, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে বিহারের এই হঠাৎ বাগড়ার কারণ কী?
‘হঠাৎ’ বলছি এই কারণে, মাস তিনেক আগেও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিজেপি-জেডিইউ জোটের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ফারাক্কা ব্যারাজ যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাগাড়ম্বর দেখা গেলেও বিহার ছিল কার্যত নিশ্চুপ। জেডিইউ বা জনতা দল ইউনাইটেড বরং খোদ ফারাক্কা ব্যারাজের ঘোর বিরোধিতা করে আসছিল।
অনেকের মনে আছে, এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় দুই দশক ধরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এবং জেডিইউর প্রতিষ্ঠাতা নীতিশ কুমার ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলে আসছিলেন ২০১৬ সাল থেকে। কেবল রাজনৈতিক দাবি তোলা নয়; তিনি এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তদবিরও করে আসছিলেন। এমন দাবির যুক্তি হিসেবে বলেছিলেন– ‘আমরা ইউপিএ সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছিলাম। এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও বলেছি, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় ব্যাপক পলি জমছে, যা প্রতিবছর বিহারে ভয়াবহ বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ। বস্তুত আমি প্রতিটি মঞ্চেই ফারাক্কা ব্যারাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছি। কারণ, গোটা গঙ্গা নদীতে পলি জমার পেছনে এটিই প্রধান কারণ এবং এই ব্যারাজ বিপুল নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহকেও ব্যাহত করছে (এনডিটিভি, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)।
বিহারে নীতিশ কুমার সরকারের জলশক্তিমন্ত্রী ছিলেন সঞ্জয় কুমার ঝাঁ। স্বাভাবিকভাবে তিনিও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ভাটিতে যেতে পারছে না বলেই বিহারে বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে। বলেছিলেন– ‘হয় ফারাক্কা ব্যারাজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলতে হবে, না হয় এর ১১৯টি জলকপাট দিয়ে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২ অক্টোবর ২০১৯)।
সেই সঞ্জয় ঝাঁ বর্তমানে দেশটির উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় জেডিইউ মনোনীত সদস্য; কিন্তু তিনি এখন সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছেন– ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে ভাটির দিকে পানি গড়াতে দেওয়া যাবে না। গত ৬ আগস্ট রাজসভায় ‘স্পেশাল মেনশন’ হিসেবে আহ্বান জানিয়েছেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি যেন নবায়ন না হয়। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বিহারে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ফেলছে। আবার এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও পত্রপাঠ আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখে জানিয়েছেন, গঙ্গা চুক্তির ব্যাপারে বিহারের ‘উদ্বেগ সম্পূর্ণ আমলযোগ্য’ এবং সরকার এসব বিষয় ‘মাথায় রেখেই’ উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে। এ বিষয়ে গত মাসে লিখেছি ‘গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: টু বি অর নট টু বি’ (সমকাল, ১১ অক্টোবর ২০২৬)।
মজার ব্যাপার, বছর দশেক আগে নীতিশ ও সঞ্জয় মিলে ফারাক্কা ব্যারাজ ভাঙার জন্য কেবল দাবি নয়, রীতিমতো রাজনৈতিক কর্মসূচিও শুরু করেছিলেন। ‘লোক সম্বাদ’ বা জনসংলাপ নামের ওই প্রচারণা কর্মসূচির একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই ওপরের বক্তব্য দিয়েছিলেন নীতিশ কুমার।
গঙ্গার প্রবাহ ও ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে বিহার রাজ্যের জোট সরকার যখন নতুন সুরে গান গাইছে, তখন সেই প্রচারণা কর্মসূচির নামও বদলানো হয়েছে; এখন ‘নীতিশ সম্বাদ’। এই প্রচারণা কর্মসূচি বিহারের গঙ্গা তীরবর্তী ১২ জেলায় কর্মসূচিও শুরু করেছে।
লক্ষণীয়, যে নীতিশ কুমার ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন; যে প্রচারণা মঞ্চ থেকে ভাটির বাংলাদেশে স্বাভাবিক প্রবাহ ছেড়ে দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছিল; সেই নীতিশের নামেই সেই মঞ্চকে বদলিয়ে সেখান থেকে এখন কার্যত ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে প্রবাহ গলতে না দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিহার রাজ্য সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর এই ডিগবাজি কৌতুককর বটে!
আরও কৌতুকের বিষয়, বিহারের সরকার ও রাজনীতিকরা গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ‘নীতিশ সম্বাদ’ থেকে এক নিঃশ্বাসে যেসব দাবি তুলছেন, সেগুলোও পরস্পরবিরোধী। যেমন তারা বলছেন, ফারাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পানি দেওয়া যাবে না; আবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পলি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। গঙ্গা দিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহ ভাটিতে নামতে না দিলে বন্যার পানি নামকে কীভাবে? আর ফারাক্কা ব্যারাজের কারণেই যে উজানের অংশে পলি জমে; নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে দুই তীরে ভাঙন সৃষ্টি করছে– সেটা কল্যাণ রুদ্রের মতো ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা রীতিমতো বই প্রকাশ করে বলেছেন। সত্তর দশক থেকে এই ধারা চলতে চলতে ভাঙন যে পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বিহারে চলে গেছে, এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না।
বিহারের সরকার ও রাজনীতিকরাও এই বাস্তবতা নিশ্চয় বোঝেন। তারপরও গঙ্গা নদী ও ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার কারণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। আমার আশঙ্কা, বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তি যাতে আগের মতো করেই নবায়ন করতে না হয়, সে জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারই ‘নতুন খেলোয়াড়’ বিহারকে মাঠে নামিয়েছে। পুরোনো খেলোয়াড় পশ্চিমবঙ্গ তো আছেই!
কথা হচ্ছে, উজানের বালকের জন্য যা খেলা, ভাটির ভেকের জন্য তা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]