সমাজ
সাবলেট থাকা নারী শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে?
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ক্ষমতার অলিন্দে বসবাসকারীদের দায় শুধু নির্দেশ পালন নয়; নির্দেশের পরিণতিও বোঝা দরকার। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটে তা প্রচলিত প্রবাদের মতো– ‘বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৭ অক্টোবর আজিমপুর কলোনির জোন-বি আকস্মিক পরিদর্শন করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে আবাসিক এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি চলাচল পথের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নত করা। কিন্তু সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের বদলে গঠন করা হলো সাবলেটে থাকা ভাড়াটে খোঁজার বিশেষ দল। চারটি দলে ভাগ হয়ে তারা মাঠে নামেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানাচ্ছে, সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের ২৯ অক্টোবর দেওয়া গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি বাসা বা ফ্ল্যাটের কোনো অংশ কিংবা সম্পূর্ণ বাসা সাবলেট দেওয়া যাবে না। যারা ইতোমধ্যে সাবলেট দিয়েছেন, তাদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ভাড়াটে সরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় বরাদ্দ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সরকারের যুক্তি, বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা, ১৯৮২ অনুযায়ী সরকারি বাসা ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য বরাদ্দ করা হয়; বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার জন্য নয়। সরকারি আবাসনের নিয়ম কার্যকর করার অধিকার সরকারের অবশ্যই আছে। কিন্তু নিয়ম বাস্তবায়নের নামে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যায় না, যাতে নিরপরাধ মানুষ বেশি বিপদে পড়েন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কথা কি ভেবেছে কেউ?
ছাত্রীনিবাসের বিপরীতে সাবলেটই ভরসা
মাস ছয় আগে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে পরিচয় হয়েছিল সন্ধ্যা, বেনু, আমেনা, অমলা ও এনির সঙ্গে। পাঁচজনই মফস্বলের মেয়ে; ঢাকার সরকারি কলেজে পড়েন। দুই কলেজেই ছাত্রীনিবাস আছে, কিন্তু তাদের কারও সেখানে জায়গা হয়নি। ফ্ল্যাট ভাড়া করে রাখার সামর্থ্য নেই পরিবারের। অমলা বলছিলেন, ‘স্যার, আমরা সাবলেট থাকি।’ তাদের কাছেই জানা, ঢাকার সরকারি কলেজগুলোর অনেক শিক্ষার্থী আজিমপুর, পলাশী, মৌচাক কলোনি, চায়না বিল্ডিং, রায়েরবাজার, ঝিগাতলা ও মিরপুরের সরকারি আবাসিক এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে দুই-তিনজন মিলে থাকেন। তুলনামূলক কম ভাড়া ও নিরাপত্তার কারণে এসব জায়গা তাদের পছন্দ। পরিচিতজন, একই এলাকার মানুষ কিংবা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সূত্র ধরে তারা বাসা খুঁজে নেন।
ছাত্রীনিবাসে আসন সংকটের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, সাবলেট তাদের কাছে কত প্রয়োজনীয়। ইডেন মহিলা কলেজে প্রায় ২৪ হাজার ছাত্রীর জন্য ছয়টি ছাত্রীনিবাসে আসন রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩২০টি। অর্থাৎ মোট ছাত্রীর ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ আবাসিক সুবিধা পান। অন্যদিকে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ ছাত্রীর বিপরীতে আবাসিক আসন মাত্র ৪২০টি। দুই কলেজ মিলিয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ছাত্রীনিবাসে স্থান পান। বাকি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তার বাস্তবসম্মত উত্তর নেই। এই সংকটের মধ্যে সরকারি কলোনির সাবলেট তাদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়।
উচ্ছেদের অভিঘাত পড়বে যেভাবে
সরকারি কোয়ার্টারে সাবলেটে থাকা শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ঢাকার বাইরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। নতুন বাসার অগ্রিম ভাড়া, জামানত, স্থানান্তর খরচ মিলিয়ে এটি বড় আর্থিক চাপ। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাসা ছাড়ার নির্দেশ তাদের বিকল্প আবাসন খোঁজার কার্যকর সময়টুকুও দেয়নি। নতুন জায়গায় বাসা খুঁজতে গিয়ে ক্লাসে উপস্থিতি ব্যাহত হবে; যাতায়াতে সময় ও খরচ বাড়বে। পরীক্ষার আগে কিংবা সেমিস্টারের মাঝখানে বাসা ছাড়তে হলে পড়াশোনার ক্ষতি আরও বেশি হবে। অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করে নিজের খরচ চালান। বাসা বদলের কারণে তাদের টিউশনি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। যেসব পরিবারের পক্ষে অর্থ জোগানো সম্ভব নয়, তাদের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। অপরিচিত এলাকায় নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং সাশ্রয়ী বাসা পাওয়ার সমস্যা রয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বিয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভিঘাতে তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নিয়মের সঙ্গে থাকুক মানবিক বিবেচনা
সরকারি বাসার বরাদ্দ বিধিমালা কার্যকর করা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগে তার সামাজিক অভিঘাত, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। সরকারি বাসা বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে যারা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই দায়ের বোঝা কেন বহন করবেন শিক্ষার্থীরা? প্রথমেই সরকারি আবাসিক এলাকায় কতজন শিক্ষার্থী সাবলেটে থাকেন; তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক অবস্থা ও শিক্ষাবর্ষ কী; জরিপ করা দরকার। এরপর তাদের বিকল্প আবাসন খুঁজে নেওয়ার জন্য কয়েক মাস সময় দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে আসন বাড়ানো, প্রয়োজনে অস্থায়ী শিক্ষার্থী আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। নারী শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং আসন্ন পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা উচিত।
আলোচনাটি শুধু সরকারি বাসার সাবলেট বন্ধ করা উচিত কিনা– সেই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া দরকার, ঢাকার সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সুবিধা যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় এত কম, সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা না করে শিক্ষার্থীদের বর্তমান আশ্রয় থেকে সরিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু বিধিমালা প্রয়োগ নয়; আইন প্রয়োগে ন্যায়বিচার ও মানবিক বিবেচনা নিশ্চিত করাও। পরিচ্ছন্ন কলোনি গড়ার পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনও সুরক্ষিত রাখা জরুরি। আইন মানুষের জন্য; মানুষকে বিপদে ফেলার জন্য নয়।
গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- গওহার নঈম ওয়ারা