সমকালীন প্রসঙ্গ
অনলাইনে নারীর নিরাপত্তা কেন উপেক্ষিত
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ১০:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যম; সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। বিশেষ করে করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং দূরশিক্ষণের বাধ্যবাধকতার কারণে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বহুমুখী ও ব্যাপক রূপ নিয়েছে। যাদের আগে মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল না, তারাও আজ দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে এক আঁধারঘেরা বাস্তবতা। প্রযুক্তি এগোচ্ছে, একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনলাইনে নারীদের ওপর সহিংসতা, হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনা।
নারী ও শিশুদের ওপর ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত সাইবার অপরাধ দিন দিন আরও জটিল ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অপরাধীরা সর্বদা সুনির্দিষ্ট ফাঁকফোকর ও সুযোগের সন্ধানে থাকে। নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে কিংবা নতুন প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়ে কীভাবে অপরাধ করা যায় এবং অপরাধের পর নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়; সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো ভিকটিমের ব্যক্তিগত ও মানসিক জীবনে এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের ন্যূনতম অনুশোচনা বা ভ্রুক্ষেপ নেই। ভিকটিমকে যে কোনো উপায়ে ব্ল্যাকমেইলিং, অপমান কিংবা সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার মাধ্যমেই যেন তারা বিকৃত মানসিক তৃপ্তি ও তথাকথিত ‘ক্ষমতা’ উপভোগ করে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভিকটিমের চরম মানসিক সংকটের সুযোগ নিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা সুসংহত করতে যে ধরনের কার্যকর, বলিষ্ঠ ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বা রাষ্ট্রীয় তৎপরতা থাকা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা দেখছি না। ফলে সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নারীরা প্রতিনিয়ত এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি নিয়ে চলাচল করছেন।
গ্রাম ও শহরের দূরত্বের ব্যবধানও এই ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ঘুচে গেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বা ডিজিটাল রাইটের সাম্প্রতিক গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভাগীয় শহর কিংবা জেলা সদরের বাইরেও গ্রামগঞ্জের নারীরা আজ এই ভার্চুয়াল সহিংসতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার। তৃণমূলের যে নারীরা ধীরে ধীরে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন কাজে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন, তারাও এ অপরাধের শিকার হয়ে থমকে যাচ্ছেন।

এই ভয়াবহ সংকট নিরসনে সরকারের ভূমিকা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যমে কোনো নারী যদি হয়রানি বা অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়ে অভিযোগ করেন, তবে সেসব প্ল্যাটফর্ম বা কর্তৃপক্ষ সেটি গুরুত্ব সহকারে আমলে নেয় না বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
অন্যদিকে, ভিকটিম যদি আইনি সহায়তার জন্য পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন, সেখানেও দেখা যায় নানা জটিলতা। মামলা করা কিংবা অপরাধীদের চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ ও আমলাতান্ত্রিক যে, অনেক সময় ভিকটিম নিজেই পুলিশি ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে পিছু হটতে বাধ্য হন। অপরাধীকে শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ঘাটতি পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সেলগুলোতে এখনও প্রকট। ফলে অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে এবং তাদের মধ্যে কোনো আইনি শাস্তির ভয় কাজ করছে না।
ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বার্থে তৈরি করা আইনগুলোর প্রয়োগ নিয়েও রয়েছে চরম অসংগতি ও বিতর্ক। আইনের অপপ্রয়োগ বা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এর দ্রুত ব্যবহার দেখা গেলেও সাধারণ নারী ও নাগরিকদের ভার্চুয়াল হয়রানি, নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে আইনটি ততটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় কোনো মামলা দায়ের করা হলেও তার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে পড়ে। তিন-চার বছর কেটে গেলেও ঠিকমতো প্রয়োজনীয় সাক্ষী বা বিশেষজ্ঞ মতামত আদালতে পেশ করা সম্ভব হয় না। ফলে জটিল ও দীর্ঘায়িত বিচার প্রক্রিয়ার কারণে আইনের উদ্দেশ্যই ভেস্তে যায় এবং অপরাধীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়।
এই চরম উদ্বেগজনক অবস্থা থেকে উত্তরণে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। ডিজিটাল অঙ্গনে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এখনই বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ডিজিটাল আইনের অধীনে নারী ও শিশুদের ওপর হয়রানির মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে হবে। অপরাধীদের শনাক্ত থেকে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার কাঠামো তৈরি করা আবশ্যক। পাশপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পুলিশের সাইবার সেলগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়। একই সঙ্গে দেশের সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘সাইবার সিকিউরিটি’ বা সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণা ছড়িয়ে দিতে হবে। কীভাবে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন ব্যবহার করতে হয়; কীভাবে নিজ অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে হয়; কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কী পদক্ষেপ নিতে হয়, সেসব বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
আইটি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সমন্বয়
দেশের আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়।
অনলাইন সহিংসতার কারণে দেশের অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণী ও নারীর জীবন এবং ভবিষ্যৎ মারাত্মক বিপর্যস্ত। এ অবস্থাকে কোনোরূপেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও গবেষণা সংস্থা যে তথ্য তুলে ধরছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচ্য। সরকারকে অবশ্যই এটি অনুধাবন করতে হবে; নাগরিকের, বিশেষ করে নারীদের অনলাইন নিরাপত্তা গৌণ বিষয় নয়, বরং এটি মৌলিক অধিকার। প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে এবং একটি বৈষম্যহীন সাম্য ও নিরাপত্তার সমাজ গঠন করতে হলে অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; সমন্বয়ক, নিজেরা করি
- বিষয় :
- খুশী কবির