বিশ্লেষণ
অস্বীকার থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন, ইশরাকের সামনে বড় পরীক্ষা
ইশরাক হোসেন (ফাইল ফটো)
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬
প্রথমে পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার খবরকে গুজব বলা, সংবাদমাধ্যমকে দোষারোপ করা, পরে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা এবং মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার– ইশরাক হোসেনের এই প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
দেশে এর আগে বিতর্কের মুখে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের নজির আছে। ২০২১ সালে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য এবং একই সময়ে ফাঁস হওয়া একটি অডিও কথোপকথন নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক সে তথ্য সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। এর মধ্যে মুরাদ হাসান ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে যান এবং সেখান থেকে ইমেইলে মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। মুরাদ হাসানের পদত্যাগ ও প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ইশরাক হোসেনের পদক্ষেপের বড় ফারাক আছে। তবে একমাত্র মিল, তারা কেউই নিজের দোষ স্বীকার করেননি।
২০১২ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারীর গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। সে সময় তিনি ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগের কথা বললেও নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছিলেন।
এ ধরনের পদত্যাগের রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ভর করে অভিযোগের প্রকৃতি, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী তদন্তের ওপর। এদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে দুটি পর্ব শেষ হয়েছে। একটি পর্ব বাকি থেকে গেছে। আওয়ামী লীগের ওই দুই নেতা মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছেন।
ইশরাক হোসেন এদের ঠিক উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য ভবিষ্যতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত এবং অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তাঁর পক্ষে কাজ করবেন– এমন কথাও বলেছেন।
ইশরাকের গত দুদিনের ধারাবাহিক কথাবার্তায় তিনটি প্রবণতা দেখা যায়। নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন। ঘটনার ব্যাখ্যায় নিজের বয়ান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন এবং পদত্যাগের মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে দলের কাছে একটি বার্তা হিসেবে সামনে এনেছেন।
সংকটের মুখে একজন রাজনীতিক কী বলেন, কীভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় কতটা গ্রহণ করেন– এগুলো তাঁর নেতৃত্বের ধরন ও রাজনৈতিক চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনাটি এ বিবেচনায় একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে।
গত শনিবার ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতির ভিডিও তিনি নিজেই প্রকাশ করেন। গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন। এর মাঝের সময়টায় তাঁর কর্মকাণ্ডকে পদত্যাগের নির্দেশের খবরের ফলে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে সমর্থকদের মনোবল অক্ষুণ্ন রাখার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে না। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সমর্থকদের উপস্থিতিও এমন সাক্ষ্য দিচ্ছে।
তবে বাস্তব সমস্যা হচ্ছে, প্রথমে একটি সংবাদকে ভিত্তিহীন বলে, পরে সেই সংবাদের মূল বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় ইশরাকের নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে তাঁর বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণে এই পর্বটি প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছেন, গেণ্ডারিয়ার অভিযানে তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয়দের উদ্যোগে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেন, অস্ত্র হাতে নিয়ে তিনি ভুল করেননি।
ইশরাক অভিযানের উদ্দেশ্য সামনে এনেছেন, কিন্তু অস্ত্র হাতে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্কের দায় স্বীকার করেননি। ব্যাখ্যায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের গুরুত্ব এবং নিজের নিরাপত্তাকে সামনে এনেছেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিচিত কৌশল। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আচরণকে বৃহত্তর কোনো জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে নিজের কর্মকাণ্ডের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকে। কিন্তু জনস্বার্থের উদ্দেশ্য থাকলেই যে সব কিছু গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে, তা ঠিক না।
একই উদ্দেশ্যে ইশরাক গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে গেছে।
আসলে ইশরাক মাদকবিরোধী উদ্যোগের পক্ষে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা বিতর্কের সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তাই তাঁর অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়া, পুলিশের ভূমিকা এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাই হবে যথাযথ পথ।
ইশরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাঁর পরবর্তী কাজের ওপর। তিনি যদি মাদকবিরোধী উদ্যোগকে আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং নিজের আচরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব দেন, তাহলে বর্তমান বিতর্ক থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজনে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা, জবাবদিহি মেনে নেওয়া এবং ক্ষমতার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা তাঁকে সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে আরও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবেন। মাদকবিরোধী কর্মসূচি জোরদার করা এবং সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর কথাও বলেছেন। বলা যায়, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পদত্যাগকে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব পালনের নতুন পরিসর হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আপাতত মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে উপস্থাপন করেছেন।
এখন দেখার বিষয়, ইশরাক কি নিজের উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ় থাকার পাশাপাশি সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন? তিনি কি মাদকবিরোধী কাজকে ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, আইনের শাসন এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারবেন?
- বিষয় :
- পদত্যাগ
- ইশরাক হোসেন
- রাজনীতি