প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
বিভক্ত জাসদ এখন চার খণ্ডে সক্রিয় রাজনীতির মাঠে
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) দলীয় মনোগ্রাম
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১২ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ঐতিহ্য অনেকটাই ম্রিয়মাণ। প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরে বারবার ভাঙন ঐক্য আবারও ভাঙনের ধারাবাহিকতায় দলটি এখন চার খণ্ডে বিভক্ত হয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
এর মধ্যে মূল জাসদ ভেঙে তৈরি হওয়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি নামের তিনটি অংশ সক্রিয়। এছাড়া দলের প্রতিষ্ঠাতা শাহজাহান সিরাজের অনুসারীরা জাসদ (শাহজাহান সিরাজ) নামে আরেকটি দলের ব্যানারে ‘নামকাওয়াস্তে’ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ অবস্থার মধ্যে আজ শনিবার উদযাপিত হচ্ছে জাসদের ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার স্লোগানে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর পল্টন ময়দানে জনসভার মাধ্যমে দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল বিরোধিতা করেই জাসদের জন্ম। প্রতিষ্ঠাকালে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আ স ম আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাত্ত্বিক নেতা প্রয়াত সিরাজুল আলম খান ছিলেন দল প্রতিষ্ঠার নায়ক।
জাসদ ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল জাসদের দুটি অংশ।
বহু ধারা-উপধারায় বিভক্তি, ঐক্য, ভাঙন
মূলত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিভক্তির কারণেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠিত হয়। গত ৫৪ বছরে জাসদের মধ্যেই রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশিবার ভাঙা-গড়া হয়েছে। মূল জাসদ ভেঙে খণ্ড খণ্ড জাসদ, বাসদসহ আরও কয়েকটি দলও গড়ে উঠেছে।
১৯৮০ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম জাসদ ভেঙে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নামে আলাদা দল গঠিত হয়। পরে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সামরিক শাসনে সমর্থন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে বিরোধের জের ধরে ১৯৮৫ সালে আবারও বিভক্ত হয়। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদ (রব) ও শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ (সিরাজ) নামের পৃথক দল গড়ে ওঠে।
ভাঙনের মধ্যে অবশ্য দলের মধ্যে ঐক্যের প্রয়াসও চলেছে বারবার। ১৯৯৭ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ ও বাসদের বিভিন্ন ধারাগুলোকে একত্র করে আ স ম আবদুর রবকে সভাপতি ও হাসানুল হক ইনুকে সাধারণ সম্পাদক করে ঐক্যবদ্ধ জাসদ গঠিত হয়। কিন্তু রবের ১০ দফা উত্থাপন নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০০২ সালের অক্টোবরে ইনু ও রবের নেতৃত্বে আবারও দলটি দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। তৈরি হয় জাসদ এবং জেএসডি নামের দুটি অংশের।
২০০৫ সালে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতার শরিকও হয় তারা। তবে ১৪ বছর একসঙ্গে পথ চলার পর ইনুর দলের মিত্ররা দল ত্যাগ করায় জাসদ আবারও ভাঙনের মুখে পড়ে। ২০১৬ সালের ১২ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচনসহ সরকারে থাকা না থাকার প্রশ্নে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে এই ভাঙন দেখা দেয়। আলাদা দল গড়ে তোলে ওই সময়কার সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন একটি অংশ। যারা এখন বাংলাদেশ জাসদ নামে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
এদিকে, জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত শাহজাহান সিরাজ ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটা ও শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা কারণে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ২০২০ সালে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে জাসদ (শাহজাহান সিরাজ) পুনর্গঠিত হয়।
কার কী অবস্থান
জাসদের মূল অংশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাসদ এবং জেএসডি নিজ নিজ আদর্শ-উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতির মাঠে নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল দুটি অংশেরই। ৯টি বামপন্থি ও প্রগতিশীল দলের সমন্বয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট এবং ১৩টি বাম গণতান্ত্রিক দলের সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটে যুক্ত রয়েছে দলটি।
জেএসডি গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই সরকারবিরোধী জোট গণতন্ত্র মঞ্চে যুক্ত ছিল। এই জোটে থেকেই বিএনপি ও তার মিত্রদের সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে যুগপৎভাবে যুক্ত ছিল দলটি। বিএনপি জোটের সঙ্গে থেকেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে জেএসডির।
অন্যদিকে, জুলাই গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত ও কারাবন্দি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) চরম বিপর্যয়ে রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক হিসেবে প্রায় দুই যুগ সক্রিয় থাকায় বিভিন্ন দল ও মহল থেকে জাসদকে ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’ উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে।
জাসদ (শাহজাহান সিরাজ) সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথে ছোটখাটো কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, ‘৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে বিভক্ত জাসদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-উত্তর অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশ ও জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে সব দেশপ্রেমিক শক্তিকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, ৫৪ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, জাসদ নেতাদের নয়, কর্মীদের দল। এই দলটি সংগ্রামের দল, ইতিহাসের দল।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাসদ আজ সকালে তোপখানা রোডের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বিকেলে শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভা করবে।
জাসদের কর্মসূচিতে রয়েছে, সকাল ৬টায় গুলিস্তানে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, বেলা আড়াইটায় শহীদদের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান এবং বেলা ৩টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা। জেএসডি এবং জাসদও (শাহজাহান সিরাজ) অনুরূপ কর্মসূচি পালন করবে।
- বিষয় :
- জাসদ