ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

বেবি ফেস আশীর্বাদ নাকি বিড়ম্বনা

বেবি ফেস আশীর্বাদ নাকি বিড়ম্বনা
×

সুরাইয়া হেনা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কমবেশি সবাই চান চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখতে। এ কারণে প্রসাধনী ব্যবহার থেকে শুরু করে জীবনযাত্রাও পরিবর্তন আনেন। চেষ্টা থাকে বয়সের তুলনায় কিছুটা হলেও নিজেকে তরুণ দেখাতে। আমাদের চারপাশে এমন অনেকে আছেন, যাদের জন্মগতভাবে মুখের গঠনে বয়সের ছাপ সহজে পড়ে না। বয়স হয়তো পঁচিশ, অথচ চেহারায় যেন আঠারোর ছাপ। বড় চোখ, গোল বা নরম মুখের গড়ন, তুলনামূলক ছোট নাক ও কোমল মুখের রেখা মিলিয়ে তৈরি হয় শিশুসুলভ এক অবয়ব। এ ধরনের মুখাবয়বকে সাধারণভাবে বলা হয় বেবি ফেস।
নামটি শুনলে যেন একটি মিষ্টি, ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। বেবি ফেস মানে কম বয়সী দেখানো, তারুণ্যের ছাপ, মায়াবী চেহারা। বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় এত সরল নয়। এ চেহারা যেমন কারও জন্য সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, তেমনি কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক জীবনে সৃষ্টি করতে পারে নানা ধরনের বিড়ম্বনার। 

যখন বেবি ফেস আশীর্বাদ  
বেবি ফেসের সবচেয়ে আলোচিত ইতিবাচক দিক হলো এর সঙ্গে কোমলতা ও উষ্ণতার ধারণা তৈরি হওয়া। দেখা যায়, শিশুসুলভ মুখাবয়বের মানুষকে অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি উষ্ণ, নিরীহ, সৎ ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথম দেখায় এ ধরনের ধারণা সামাজিক যোগাযোগে, নেটওয়ার্কিংয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বেবি ফেসের আরেকটি স্বাভাবিক সুবিধা হলো বয়সের তুলনায় কম বয়সী দেখানো। বয়স বাড়লেও মুখে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকলে অনেককে প্রকৃত বয়সের চেয়ে কম মনে হতে পারে। ফলে তারুণ্যের ছাপ দীর্ঘদিন ধরে থাকার বিষয়টি অনেকের কাছে আকর্ষণীয়।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ চেহারা কখনও সুবিধা তৈরি করতে পারে। শিশুসুলভ মুখ অনেক সময় মানুষের মধ্যে যত্ন বা সুরক্ষার মনোভাব তৈরি করে। ফলে কারও কাছে খুব সহজে যাওয়া যায়। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, কারও মুখ দেখে তাকে সৎ, নিরীহ বা বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হওয়া আর তিনি বাস্তবে তেমন মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। এটি মূলত মানুষের তৈরি করা একটি প্রাথমিক ধারণা।

বেবি ফেস যখন বিড়ম্বনার কারণ 
সমস্যা শুরু হতে পারে তখনই, যখন শিশুসুলভ চেহারাকে ব্যক্তিত্ব বা সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেবি ফেসের সঙ্গে শুধু উষ্ণতা বা বিশ্বাসযোগ্যতার ধারণা যুক্ত নয়, বরং কম পরিণত, কম কর্তৃত্বশীল কিংবা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ার ধারণাও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একই বৈশিষ্ট্য এক পরিস্থিতিতে সুবিধা দিতে পারে, আবার অন্য পরিস্থিতিতে অসুবিধার কারণ হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে যদি চেহারার কারণে বয়সে ছোট মনে হয়, তাহলে তার অভিজ্ঞতা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও অন্যরা অজান্তে ধারণা তৈরি করতে পারেন। বিশেষ করে নেতৃত্ব, দায়িত্ব বা কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত অবস্থানে চেহারা থেকে তৈরি হওয়া এই প্রথম ধারণা কখনও কখনও প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকটি বিড়ম্বনা হলো, বয়স নিয়ে অহেতুক মন্তব্য। বেবি ফেসের অধিকারী অনেক প্রাপ্তবয়স্ককে শুনতে হয়, ‘তোমাকে তো বয়সে অনেক ছোট লাগে।’ কথাটি প্রশংসা হিসেবে বলা হতে পারে। নিয়মিত এমন মন্তব্য শুনতে শুনতে কারও কাছে তা বিরক্তিকরও হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যখন তার বয়স বা পরিচয়ের চেয়ে চেহারাটি মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মুখের বৈশিষ্ট্য থেকে মানুষের চরিত্র বা যোগ্যতা বিচার করার সীমাবদ্ধতা। কারণ, মানুষ মুখ দেখে দ্রুত বিভিন্ন সামাজিক ধারণা তৈরি করলেও সেই ধারণা সবসময় ব্যক্তির প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের নির্ভুল প্রতিফলন নয়। একজনের চেহারা তাঁকে যেমন দেখায়, তাঁর বাস্তব ব্যক্তিত্ব তেমন নাও হতে পারে। 
তাই বেবি ফেসকে এক কথায় আশীর্বাদ কিংবা বিড়ম্বনা বলা কঠিন। এটি মূলত একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যার ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা অনেকটাই নির্ভর করে পরিস্থিতি ও অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। একই মুখ কারও কাছে মায়াবী, কারও কাছে বয়সের তুলনায় কম পরিণত, আবার কারও কাছে নিছক একটি মুখ। মানুষের পরিচয় তার চোখ, নাক, গালের গড়ন কিংবা মুখের রেখায় নির্ধারিত হয় না। একজন মানুষের কাজ, আচরণ, চিন্তা ও দায়িত্ববোধ তার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি বলে। বেবি ফেস তাই আশীর্বাদও নয়, বিড়ম্বনাও নয়। আসল পার্থক্য তৈরি করে সেই চেহারাকে আমরা কীভাবে দেখি এবং তার বাইরে থাকা মানুষটিকে কতটা দেখার চেষ্টা করি তার ওপর। 
মডেল: আনিকা

আরও পড়ুন

×