ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

পূজার শাড়িতে রঙের খেলা

পূজার শাড়িতে রঙের খেলা
×

এবার পূজার শাড়িতে বাহারি নকশা ও থিমের রাজত্ব চলছে ছবি: বিশ্বরঙ

তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের শিশিরভেজা ঘাস, ঝরে পড়া শিউলির মিষ্টি সুবাস, নদীর ধারে ফুটে থাকা কাশফুল আর নীল আকাশ–প্রকৃতির এ চেনা আয়োজনে যেন মিশে থাকে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। শহরের অলিগলি থেকে শপিংমল–সবখানে এখন চলছে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। পূজার সাজপোশাকের ক্ষেত্রে শাড়ির জায়গাটি বরাবরই আলাদা। লিখেছেন তাসলিমা তামান্না

ষষ্ঠী থেকে দশমী–পূজার প্রতিটি দিন বিশেষ করে তুলতে নারীর চেষ্টা থাকে মানানসই উৎসবের শাড়ি বেছে নিতে। বরাবরের মতো এবারও দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে এসেছে বাহারি নকশা এবং বিভিন্ন থিমের পূজার শাড়ি। প্রতিটি শাড়ির আঁচলে, পাড়ের নকশায়, রঙের খেলায় ফুটে উঠেছে বাঙালিয়ানার নিজস্ব সৌন্দর্য।
উৎসবের দিনগুলোয় কেউ বেছে নেন মায়ের বা ঠাকুরমার পুরোনো শাড়ি, কেউ আবার নতুন নকশা ও রঙের শাড়িতে সাজতে চান। এবার পূজার শাড়িতে থাকছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। গাঢ় রঙের পাশাপাশি প্যাস্টেল, মাটি-রঙা, নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি বা উজ্জ্বল রঙের শাড়ি হতে পারে উৎসবের সঙ্গী। টাঙ্গাইলের শাড়ি থেকে শুরু করে তাঁত, ডিজিটাল প্রিন্ট, জামদানি, কাতান, মসলিন, অরগাঞ্জা, সিল্ক, হাফসিল্ক–চেনা শাড়িগুলো পূজায় ফিরছে নতুন রং আর নকশায়। বিশ্বরঙ, কে ক্র্যাফট, রঙ বাংলাদেশ, হরীতকী, সাতকাহন, সরলা, লা রিভ, টুয়েলভ ক্লদিং, অঞ্জন’সসহ সব ব্র্যান্ডে চলে এসেছে পূজার শাড়ি। সেসব শাড়িতে রয়েছে বাহারি নকশা ও থিমের রাজত্ব।

উৎসবে শাড়ির কদর
বাঙালি সংস্কৃতিতে নারীর সৌন্দর্যকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে শাড়ি। যতই নিত্যনতুন পোশাক আসুক না কেন, শাড়ির বিকল্প নেই। আভিজাত্য, ঐতিহ্য থেকে স্মার্টনেস–সবই যেন লুকিয়ে এই ১২ হাত কাপড়ে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, যুগ যুগ ধরে শাড়ি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন করছে। তাই ঐতিহ্যের সাজে সাজার কথা হলে প্রথমে আসে শাড়ির কথা। আজকাল অল্প বয়সী মেয়েদের মধ্যেও উৎসবে শাড়ি পরার প্রবণতা বাড়ছে। যদিও চারপাশের পরিবেশ, সমাজব্যবস্থায় আগের তুলনায় নারীর মধ্যে শাড়ি পরার চল কমে গেছে। উৎসবগুলোয় ঠিকই ছোট থেকে বড়–সব বয়সী নারীই শাড়ি পরতে পছন্দ করেন।

সাদা-লালের বাইরে 
বড় টিপ, চোখভরা কাজল আর লাল-সাদা শাড়ি– পূজার মধ্যে এ সহজ সাজে যেন বাঙালিয়ানার আসল সৌন্দর্যটা ধরা পড়ে। বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার বিপ্লব সাহাও বললেন একই কথা। তাঁর ভাষায়, পূজায় লাল-সাদা শাড়ির আবেদন অন্যরকম হয়। এগুলো চিরন্তন সুন্দর। তবে এখন সেই চেনা গণ্ডি পেরিয়ে শাড়িতে জায়গা করে নিচ্ছে নানা ধরনের প্যাস্টেল কিংবা উজ্জ্বল রং। মেরুন, গাঢ় সবুজ, নীল, বেগুনি, কমলা, হলুদ কিংবা মাটির কাছাকাছি টোনের শাড়িও প্রাধান্য পাচ্ছে পূজার সংগ্রহে। বিশেষ করে পাড় ও আঁচলে বৈপরীত্যের রং থাকলে শাড়ির সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে।

জামদানিতে চিরচেনা সৌন্দর্য
উৎসবের শাড়িতে জামদানির আবেদন সবসময়ই অমলিন। ক্রেতার চাহিদার কথা চিন্তা করে ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ির নকশায় আসছে নিয়মিত পরিবর্তন। হালকা কাজের জামদানি দিনের অনুষ্ঠানের জন্য যেমন আরামদায়ক, তেমনি জমকালো পাড় বা আঁচলের নকশার জামদানি সন্ধ্যার আয়োজনে পরা যায়। যারা খুব বেশি সাজগোজ পছন্দ করেন না, তাদের জন্য হালকা রঙের জামদানি হতে পারে চমৎকার পছন্দ। 

তাঁতের শাড়িতে স্বস্তি
পূজার কয়েকদিন ঘোরাঘুরি, মণ্ডপে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা–সবই থাকে। তাই শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, শাড়িটি আরামদায়ক হওয়াও জরুরি। এ ক্ষেত্রে তাঁতের শাড়ি হতে পারে ভালো পছন্দ। সুতি বা হালকা তাঁতের শাড়ির সঙ্গে ছোট পাড়, জ্যামিতিক নকশা কিংবা ফুলেল মোটিফ এখন বেশ মানানসই।  

সিল্ক, কাতান, মসলিনে উৎসবের আমেজ
যারা একটু জমকালো সাজ পছন্দ করেন সারাদিন কাজকর্ম শেষে সন্ধ্যায় মণ্ডপে ঘুরতে সিল্ক, কাতান, মসলিনের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। ফ্যাশন হাউসগুলোয় সহজেই পেতে পারেন এ ধরনের শাড়ি। 

মোটিভে থিমে 
এবারের পূজার শাড়িতে বিভিন্ন ধরনের মোটিভ প্রাধান্য পেয়েছে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর শাড়িতে। ডিজাইনার বিপ্লব সাহা জানান, ‘বিশ্বরঙের’ তৈরি পূজার শাড়িতে পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মোটিভ ছাড়াও দেব-দেবীসহ ঐতিহাসিক স্থানের মোটিভ প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি আরও জানান, পূজার সময় সকালে যখন সবাই অঞ্জলি দিতে যায় তখন এ শাড়িগুলো বিশাল ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, শাড়িগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে; যাতে দুর্গাপূজা ছাড়াও যে কোনো প্রার্থনার সময় মন্দিরে পরা যাবে। সকাল থেকে সন্ধ্যায় পরার উপযোগী বিভিন্ন ধরনের শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে তাদের শোরুমগুলোয়। 
এবার দুর্গাপূজায় বেশ কিছু ভিন্নধর্মী থিম নিয়ে কাজ করেছে অনলাইন ফ্যাশন হাউস ‘হরীতকী’। প্রতিষ্ঠানটির ডিজাইনার ও কো-ফাউন্ডার অনিক কুন্ডু জানান, এসব থিমের মধ্যে মহারানী, নীলাঞ্জলি, শঙ্খশ্রী, শঙ্খিনীমালা, নীলাম্বরী, ঘোটকী অন্যতম। দেবীর আগমনকে কেন্দ্র করে কালো শাড়িতে ঘোড়ার মোটিফ নিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে ঘোটকী শাড়িতে। সাদা শাড়ি লাল পাড়ে আল্পনা ও শঙ্খের মোটিফে ডিজাইন করা হয়েছে শঙ্খশ্রী শাড়ি। নীল শাড়িতে গ্রামীণ ও পাহাড়ি জীবনযাপন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নীলাম্বরী শাড়িতে। এভাবে প্রায় প্রতিটি শাড়ির রয়েছে আলাদা আলাদা গল্প। দুর্গোৎসবের জন্য তারা বেছে নিয়েছেন হাফসিল্ক, ম্যাট ও গ্লসি আর্টসিল্ক, কাতান সিল্কের শাড়ি।   
রঙ বাংলাদেশের এবারের পূজার আয়োজনের মূল প্রেরণা নেপালের ঐতিহ্যবাহী কাঠখোদাই শিল্প। এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস জানান, নেপালের কাঠখোদাইয়ের ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারুশিল্পীদের হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে। মন্দির ও প্রাচীন স্থাপত্যের কাঠের কাজে ধরা পড়ে তাদের সূক্ষ্ম শিল্পবোধ। সেই শিল্পভাষা থেকে রঙ বাংলাদেশ খুঁজে নিয়েছে এবারের উৎসবের পোশাকের নকশাভাবনা। কটন, হাফশিল্ক, অরগাঞ্জা সিল্ক, সফট সিল্ক শাড়িতে উঠে এসেছে সেসব শিল্পকর্ম। 

শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজেও নজর
শাড়ির সঙ্গে মানানসই ব্লাউজ না হলে পোশাকটির সৌন্দর্য ঠিকমতো ফুটে ওঠে না। এবারও শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ব্লাউজ পরার পাশাপাশি কনট্রাস্ট রঙের ব্লাউজের চল থাকবে। কলার, বোট নেক, ভি নেক, গোল গলা কিংবা হাতাকাটা–নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী নকশা বেছে নিতে পারেন।

দরদাম 
পূজার শাড়ি কিনতে আড়ং, বিশ্বরঙ, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, নিপুণ, দেশাল, নাগরদোলা, সাতকাহন, হরীতকীতে ঢুঁ মারতে পারেন। বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, সীমান্ত স্কয়ার, শ্যামলী স্কয়ার, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হকার্স মার্কেট, মৌচাক মার্কেটসহ আপনার নিকটবর্তী যে কোনো মার্কেটে মিলবে পূজার শাড়ি। ফ্যাশন হাউসগুলোয় এক-দুই হাজার টাকার মধ্যে হালকা সুতি বা হ্যান্ডলুম শাড়ি যেমন মিলছে, তেমনি সিল্ক, মসলিন, কাতান বা বিশেষ কারুশিল্পের শাড়ির দাম পড়বে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার ওপরে। ফ্রেবিক ও নকশাভেদে এর চেয়ে বেশি দামেরও শাড়ি মিলছে। অষ্টমীর দিনের হালকা তাঁত থেকে নবমীর জমকালো শাড়ি–বাজেট অনুযায়ী কিনতে পারেন এসব শোরুম থেকে। 

আরও পড়ুন

×