কাঠমান্ডুর বৌদ্ধনাথ স্তুপায়
বৌদ্ধনাথ স্তুপার ভেতরে শত শত কবুতর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়
সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বলা হয়, নেপাল নামের উৎপত্তি দুটি শব্দ– নে (পবিত্র) এবং পাল (গুহা) থেকে এসেছে। এর অর্থ পবিত্র গুহা। এই পবিত্র গুহা বা নেপাল শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বিশ্বের অনিন্দ্যসুন্দর এবং আকর্ষণীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
নেপালের লুম্বিনিতে জন্মেছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ। তাই কাঠমান্ডু বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ভ্রমণ একটি মূল্যবান সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। স্তূপগুলো ঘুরে দেখার সময় আপনি সন্ন্যাসীদের আবৃত্তি, প্রার্থনার চাকা ঘুরাতে এবং ভক্তদের আচার-অনুষ্ঠান করতে দেখতে পাবেন। এটি একটি পবিত্র এবং অত্যন্ত আধ্যাত্মিক স্থান, যা নেপালে বৌদ্ধধর্মের একটি শক্তিশালী পরিচয় দেয়। সেদিন ছিল নেপাল ভ্রমণের চতুর্থ দিন। সকালের নাশতা সারলাম ফলের জুস, ডিম সেদ্ধ, পাউরুটি টোস্ট, সবজি দিয়ে। এর মধ্যে সুমিত দা এসে হাজির। আমাদের গন্তব্য ছিল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত বৌদ্ধনাথ স্তুপা। দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। চার চাকার বাহনে চড়ে পিচঢালা পথে এগিয়ে চলছি। পথে অসংখ্য চায়ের দোকান, কফি শপ, ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট। বেশির ভাগ দোকান চালাচ্ছেন নারীরা। সুমিত দা জানালেন, পর্যটন এলাকায় পুলিশ খুবই কড়া। তাই নারীরা কাজ করলেও কাঠমান্ডু শহরে যৌন হয়রানি বা এ ধরনের অপরাধ নেই বললেই চলে।
অবশেষে পৌঁছলাম বৌদ্ধনাথ স্তুপা প্রবেশ দ্বারে। এখানে সার্কভুক্ত দেশের জন্য প্রবেশ মূল্য নেপালি ১০০ রুপি। অন্যান্য দেশের জন্য ৪০০ নেপালি রুপি। অসাধারণ কারুকার্য খোচিত প্রবেশ দ্বার। এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। দূর থেকে মনে হচ্ছিল গৌতম বুদ্ধ যেন তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। ভেতরে বেশ কিছু দোকানে নানা ধরনের অ্যান্টিক, গহনা, পর্যটন-স্মারকসহ নেপালের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্য সাজানো। রেস্টুরেন্টও আছে কিছু। সব জায়গাতেই পুণ্যার্থী আর পর্যটকের ভিড়। ৩৬ মিটার বা ১১৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে এটি নেপালের বৃহত্তম প্যাগোডা। চারপাশে ৫০টির মতো তিব্বতি মন্দির। ১৯৭৯ সালে এটি স্বয়ম্ভুনাথ স্তুপার সঙ্গে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। নেপালের গোপাল রাজাবংশাবলি অনুযায়ী বৌদ্ধনাথ স্তুপা লিচ্চবি রাজ শিবাদেব (৫৯০-৬০৪ খ্রি.) বা রাজা মানদেব (৪৬৪-৫০৫ খ্রি.) নির্মাণ করেন। তিব্বতিদের মতে, রাজা ত্রিসং দেটসান এটি নির্মাণ করেছিলেন। পথ নির্দেশনা দেখে আমরা এগিয়ে চললাম। কারুকার্যখচিত পিতলের অসাধারণ সুন্দর গেট দেখতে পেলাম। চারপাশের ধুপের গন্ধের মোহনীয় আবেশ আমাদের নিয়ে গেল এক অপার্থিব ভুবনে। একটু পরপর দেখা পেলাম ধ্যানরত বৌদ্ধ সাধুদের। আরেকটি কক্ষে ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে দিচ্ছেন দর্শনার্থীরা। আমরাও ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে দিলাম সবার মঙ্গল কামনায়। মন্দিরের প্রায় সর্বত্রই আছে প্রার্থনার হুইলার। পুণ্যের আশায় পুণ্যার্থীরা এটি ঘোরান। ড্রাম আকৃতির এ হুইলার কাঁসা-পাতিল বা বিভিন্ন ধাতবের তৈরি। প্রতিটি হুইলারের গায়ে বৌদ্ধধর্মের বাণী খোদাই করে লেখা। অসংখ্য ছোট্ট বাটিতে নানা রঙের ফুল রাখা। এটি খুব সম্ভবত প্রার্থনার অংশ। কোথাও কোথাও সাধুরা শুয়ে আছেন। এ এক অন্যরকম অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। শত শত মানুষ প্রেয়ার হুইল নিয়ে বৌদ্ধনাথ স্তুপার চারপাশ ১০৮ বার প্রদক্ষিণ করছেন। বৌদ্ধনাথ স্তুপার একটি পাশে দেখতে পেলাম শত শত কবুতর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এবার আমাদের ফিরে যাওয়ার পালা।
কাঠমান্ডুতে ভ্রমণ খরচ
দলবল বা দুই-তিনজন মিলে গেলে খরচ অনেকটা কমে যায় কাঠমান্ডু ভ্রমণের ক্ষেত্রে। কাঠমান্ডু ও অন্য দর্শনীয় স্থান (যেমন পোখরা) ভ্রমণ করলে বিমানে যাওয়া-আসা এবং দুই-তিন দিন থাকা-খাওয়া ও ঘোরাঘুরির ক্ষেত্রে জনপ্রতি খরচ পড়বে প্রায় ৩০-৩২ হাজার টাকার মতো। বাই রোডে গেলে এ ক্ষেত্রে ছয়-দশ হাজার টাকা বাঁচানো সম্ভব। কাঠমান্ডুতে দেখার স্থানগুলো মোটামুটি কাছাকাছি হওয়ায় তেমন খরচ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য মন্দিরগুলোর টিকিট বিদেশিদের থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম দামে পাওয়া যায়। খাবারের থালি নেপালে ১৫০-৩০০ রুপির মধ্যে পাওয়া যায়।
কাঠমান্ডু ভ্রমণ টিপস
যেহেতু নেপাল হিন্দুরাজ্য তাই সেখানে গিয়ে খাবার-দাবার বা তাদের মন্দির ঘোরানোর সময় ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি যথাসম্ভব সম্মান দেখান। টাকা বিমানবন্দর থেকে না ভাঙিয়ে বাইরে মানি একচেঞ্জ থেকে ভাঙালে রেট বেশি পাওয়া যায়। তবে মোবাইল সিমটি বিমানবন্দর থেকে কেনাই ভালো। যেহেতু নেপাল ঠান্ডার দেশ, তাই হোটেল নেওয়ার আগে গরম পানির ব্যবস্থা কেমন তা ভালোভাবে জেনে নেওয়া ভালো। অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য পাসপোর্ট, পাসপোর্টের ফটোকপি, রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি, রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং তথ্য (অনেক সময় লাগতে পারে), ডলার এনডোরসমেন্ট, চাকরিজীবী হলে এনওসি এবং শিক্ষার্থী হলে আইডি কার্ড সঙ্গে রাখা জরুরি।
- বিষয় :
- ভ্রমণ