কিশোর-কিশোরীদের মোবাইল আসক্তি
আড্ডায় বসলেও সবাই নিজ নিজ মোবাইল দেখায় ব্যস্ত থাকে ছবি: মঞ্জু আলম
নাঈমা ইসলাম অন্তরা
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ফোনটা রাখ!’ ‘আর ৫ মিনিট!’ এ ছোট্ট কথোপকথন এখন অনেক পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমে মোবাইল, পড়তে বসেও মোবাইল, খাওয়ার টেবিলে মোবাইল, এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও হাতে মোবাইল। কিশোর-কিশোরীদের জীবনে স্মার্টফোন যেন প্রয়োজনের পাশাপাশি অভ্যাস, বিনোদন এবং কখনও কখনও মানসিক আশ্রয়ও হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো–একজন কিশোর কেন মোবাইল ছাড়তে পারছে না?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু ‘বেশি ফোন ব্যবহার’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। কৈশোর আত্মপরিচয় গঠন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সামাজিক মাধ্যমে লাইক, কমেন্ট, মেসেজ বা নতুন কনটেন্ট তাৎক্ষণিক আনন্দ ও সামাজিক স্বীকৃতির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। ফলে বারবার ফোন দেখার অভ্যাস তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবে বেশি ব্যবহার মানেই আসক্তি নয়। সমস্যা তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন মোবাইল ব্যবহারের কারণে একজন কিশোরের ঘুম, পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক জীবন বা দৈনন্দিন দায়িত্বে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটে এবং সে নিজের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়।
কখন উদ্বিগ্ন হবেন অভিভাবক?
কিশোর মোবাইল ব্যবহার করছে–এটি একা কোনো বিপদের লক্ষণ নয়। বরং দেখতে হবে তার ব্যবহারের ধরন ও ফলাফল। যেমন ফোন সরিয়ে নিলে অতিরিক্ত রাগ বা অস্থিরতা, রাত জেগে স্ক্রিন দেখা, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, খাওয়া-ঘুমের রুটিন বদলে যাওয়া কিংবা ক্ষতি বুঝেও মোবাইল ব্যবহার কমাতে না পারা–এসব সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
গবেষণায় ‘প্রবলেমেটিক স্মার্টফোন ইউজ’-এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্নতার উপসর্গ ও মানসিক চাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কতা রয়েছে–এ সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অর্থাৎ অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার যেমন মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তেমনি উদ্বেগ, একাকিত্ব বা বিষণ্নতার কারণে একজন কিশোরও বেশি সময় মোবাইলে আশ্রয় নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ‘রিক্রিয়শনাল স্ক্রিন’ টাইম কমানো এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরিবর্তে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তাহলে সমাধান কী?
সমাধান শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া নয়। একজন কিশোরকে ‘তুমি ফোনে আসক্ত’, ‘তুমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছ’–এভাবে দোষারোপ করলে সে আরও প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। বরং অভিভাবকের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বোঝার চেষ্টা করা। প্রশ্ন হতে পারে–‘ফোনে কী করলে তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে?’ ‘ফোন না থাকলে তোমার কেমন লাগে?’ ‘ইদানীং কি কোনো বিষয় তোমাকে বেশি চিন্তিত বা একা লাগাচ্ছে?’
কারণ অনেক সময় স্ক্রিনের আড়ালে থাকে একাকিত্ব, পড়াশোনার চাপ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, বন্ধুত্বের সমস্যা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সও শিশু-কিশোরদের জন্য একক কোনো ‘স্ক্রিন-টাইম সীমা’ নির্ধারণের পরিবর্তে বয়স, প্রয়োজন, ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ, পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ফ্যামিলি মিডিয়া প্ল্যান’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়।
পরিবারে তাই কিছু সহজ নিয়ম করা যেতে পারে– খাবারের সময় ফোন নয়, পড়াশোনার সময় বিনোদনমূলক স্ক্রিন নয়, ঘুমের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ এবং রাতে ফোন শোবার ঘরের বাইরে রাখা। পাশাপাশি খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।
মোবাইল শত্রু নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারই সমস্যা।
একজন কিশোরের হাত থেকে ফোন সরিয়ে নেওয়ার আগে তার মন থেকে কী হারিয়ে যাচ্ছে, সেটি দেখুন। হয়তো সে শুধু একটি ভিডিও দেখছে না–সে খুঁজছে বন্ধুত্ব, স্বীকৃতি, আনন্দ, ব্যস্ততা কিংবা নিজের কোনো অস্বস্তিকর অনুভূতি থেকে সাময়িক মুক্তি।
যুদ্ধ নয়, সম্পর্ক তৈরি করুন
নিয়মের পাশাপাশি দিন সময়, শাসনের পাশাপাশি দিন বোঝাপড়া আর মোবাইল কমানোর পাশাপাশি তৈরি করুন বাস্তব জীবনে আনন্দ পাওয়ার বিকল্প।
ঘুম, পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক বা মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দিলে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কখনও কখনও সমস্যাটি ফোনে নয়; রয়ে যায় ফোনের আড়ালে থাকা মনটিতে।
লেখক: সাইকোলজিস্ট এবং টিম ম্যানেজার, সিডিডি
- বিষয় :
- কিশোর