ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

শরতের শুভ্রতায় ত্বক

শরতের শুভ্রতায় ত্বক
×
×

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরতের ভ্যাপসা গরমের প্রভাব ত্বকে বেশ ভালোভাবে ধরা পড়ে। এ সময় অনেকের চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে কড়া রোদের কালচে ছাপ। আবার সামনে দুর্গাপূজা। তাই ত্বকের যত্ন কেমন হবে তা নিয়ে অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। পড়বেই বা না কেন? ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে যত্নের ধরনেও পরিবর্তন আনা চাই। দুর্গাপূজার সাজগোজ, মেকআপের জন্য ত্বককে আগে থেকে প্রস্তুত করারও প্রয়োজন রয়েছে। রূপচর্চা ঘরে করুন কিংবা পার্লারে, সহজ ও সাধ্যের মধ্যে যেন করা যায় সেটি চান অনেকে। ত্বকের ধরন বুঝে তো অবশ্যই। নয়তো ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারেও ত্বকে জ্বালা বা র‌্যাশ দেখা দিতে পারে।
লিখেছেন রিক্তা রিচি

শরতের এ সময়টায় অনেকের ত্বক আগের তুলনায় শুষ্ক বা রুক্ষ মনে হতে পারে। বিশেষ করে মুখ ধোয়ার পর ত্বক টানটান লাগলে বুঝতে হবে, এখন ত্বকে আর্দ্রতার প্রয়োজন রয়েছে। মুখ পরিষ্কারের জন্য কেমিক্যালযুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার না করে ত্বকের ধরন অনুযায়ী মৃদু ক্লিনজার বেছে নিন। মুখ ধোয়ার পর বেশি সময় অপেক্ষা না করে ময়েশ্চারাইজার লাগানো ভালো। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা জেলভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার আর শুষ্ক ত্বকের জন্য একটু সমৃদ্ধ ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।
শোভন’স মেকওভারের কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা জানান, পূজার অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে ত্বকের একটি সহজ রুটিন তৈরি করা ভালো। সকালে মৃদু ক্লিনজার, ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন লাগান। রাতে মুখ পরিষ্কার করে প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার মাখতে ভুলবেন না। ত্বকের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, পূজার এক বা দুদিন আগে ত্বকে নতুন কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ঠিক নয়। নতুন ফেসিয়াল, নতুন ফেসপ্যাক কিংবা অপরিচিত কোনো স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট বা ত্বকের যত্নের সামগ্রী ব্যবহার করে হঠাৎ অ্যালার্জি বা ব্রণ হলে উৎসবের আনন্দটা মাটি হতে পারে। 
এ তো গেল প্রতিদিনকার যত্নের কথা। ত্বকের কালচে দাগ দূর করা, ত্বককে উজ্জ্বল করার জন্য ঘরোয়া ফেসপ্যাকে ভরসা রাখতে পারেন। 
ত্বকের উজ্জ্বলতায় কেমন ফেসপ্যাক
দুই চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে এক চামচ মধু মিশিয়ে নিন। মুখে ৩০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বককে ভেতর থেকে সতেজ রাখবে এবং ঔজ্জ্বল্য ফেরাতে সহায়ক হবে। ত্বকে আর্দ্র ও সতেজ ভাব বজায় রাখতে অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে পরিমাণমতো গোলাপজল মিশিয়ে মুখে ব্যবহার করতে পারেন। এটি তৈলাক্ত ভাব কমিয়ে ত্বক উজ্জ্বল করে। আবার তাজা অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে মধু ও টকদই ভালোভাবে মিশিয়ে একটি মসৃণ প্যাক তৈরি করুন। পরিষ্কার ত্বকে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখলে মৃত কোষ দূর হবে এবং ত্বক নরম ও উজ্জ্বল হবে। 
দুই চা চামচ বেসন, এক চা চামচ টকদই, সামান্য হলুদ গুঁড়া এবং আধা চা চামচ মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে মুখে লাগাতে পারেন। বিশেষ করে তৈলাক্ত ত্বকের জন্য এটি দারুণ উপকারী। 
ব্রণ তাড়াতে যেমন ফেসপ্যাক
অ্যালোভেরা, হলুদ ও মধু মিশিয়েও ফেসপ্যাক তৈরি করতে পারেন। সামান্য একটু হলুদ গুঁড়া, এক চা চামচ মধু এবং অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে ত্বকে লাগালে ব্রণের দাগ হালকা হবে। কাঁচা হলুদ ও নিমপাতা বেটে একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগালেও উপকার মেলে। এটি ব্রণ ও ব্যাকটেরিয়া দূর করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
মধু ও দারচিনির গুঁড়া ব্রণ ও এর দাগ দূর করতে কার্যকর। এক টেবিল চামচ খাঁটি মধুর সঙ্গে আধা চা চামচ দারচিনি গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। মুখে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ফোলাভাব ও প্রদাহ কমায়।
ত্বকের অতিরিক্ত তেল দূর করতে মুলতানি মাটির সঙ্গে পরিমাণমতো গোলাপ জল মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে নিন। এটি মুখে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। যে প্যাকই ব্যবহার করেন না কেন, অতিরিক্ত ঘষাঘষি করবেন না। ত্বক যত বেশি ঘষবেন, তত বেশি উজ্জ্বল হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশনে ত্বকে জ্বালা, লালচে ভাব বা সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। এক্সফোলিয়েশন হলো, ত্বকের যত্ন নেওয়ার এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ত্বকের ওপরের অংশে জমে থাকা মৃত কোষ পরিষ্কার করা হয়।
হাত ও পায়ের যত্নে
মুখের পাশাপাশি হাত, পা, গলা-ঘাড়ের যত্ন নেওয়া চাই। একটি পাকা কলা চটকে তাতে এক চামচ মধু ও এক চামচ দুধ মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এটি হাত ও পায়ে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলতে পারেন। হাত-পায়ের খসখসে ভাব দূর করতে এক চা চামচ চিনি ও লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে আলতো করে ঘষুন। কিছু সময় রেখে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন।
ত্বকের ধরন বুঝে ফেসিয়াল 
স্বাভাবিক ও শুষ্ক ত্বকের জন্য হারবাল, ময়েশ্চারাইজিং অথবা হাইড্রেটিং ফেসিয়াল বেছে নিতে পারেন। তৈলাক্ত ও ব্রণপ্রবণ ত্বকে ডিপ ক্লিনজিং, পার্ল, সিলভার, অরেঞ্জ, গোল্ড বা লাইটেনিং ফেসিয়াল উপকারী। মিশ্র ত্বকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত বা এসেনশিয়াল অয়েলযুক্ত স্পা ফেসিয়াল কাজে দেয়। যাদের ত্বকে ডিপ ক্লিনজিং দরকার তারা হাইড্রাফেসিয়াল কিংবা বায়ো হাইড্রাফেসিয়াল করাতে পারেন। যাদের ত্বকে মেছতা, হাইপার পিগমেন্টেশন, অসম ও বাদামি দাগ, সানট্যান, বড় পোরস আছে তারা এ ফেসিয়াল করতে পারবেন। যাদের ত্বক ব্রণপ্রবণ তারাও হাইড্রাফেসিয়াল করতে পারবেন। হোয়াইট হেডস, ব্ল্যাকহেডসও কমাতে সাহায্য করে হাইড্রাফেসিয়াল। 
হাইড্রাফেসিয়াল ত্বকের গভীর থেকে ময়লা দূর করে, ওপেন পোরসের সমস্যা কমায় এবং ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। মোটকথা ত্বককে সতেজ ও সুন্দর করতে সাহায্য করে এ ফেসিয়াল। 
পাঁচটি ধাপে হাইড্রাফেসিয়াল করা হয় বলে জানান রাজিয়া’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও রূপবিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা। তিনি জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ক্লিনজিংয়ের মাধ্যমে ত্বকের অতিরিক্ত ময়লা, তেল ও মৃত কোষ দূর করা হয়। একই সঙ্গে হাইড্রা সাকশন দিয়ে ব্ল্যাকহেডস, হোয়াইটহেডস দূর করা হয়। হাইড্রা সাকশন হলো জলীয় শোষণ বা ত্বক থেকে জল ও শোষণের মাধ্যমে ময়লা টেনে বের করা। তৃতীয় ধাপে ত্বকের সানবার্ন, রিঙ্গেলস দূর করা হয়। এতে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে। স্বাভাবিকভাবে ত্বক আগের চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত দেখায়। চতুর্থ ধাপে ত্বক হাইড্রেট করা হয় এবং ত্বকের পোরস থেকে বিভিন্ন ময়লা দূর করা হয়। পঞ্চম ধাপে ত্বকের জন্য পুষ্টিকর সিরাম ইনফিউজ করা হয়। ফলে ত্বক হয় উজ্জ্বল ও সতেজ। সবশেষে হালকা থেরাপি দেওয়া হয়, যা রিঙ্কেলস এবং ত্বকের তেল দূর করতে সাহায্য করে।
এ ফেসিয়ালে অনেক ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। তাই নামহীন কোনো পার্লার থেকে এ ফেসিয়াল না করা ভালো। যে পার্লার ও চিকিৎসকের নিজস্ব অ্যাস্থেটিক সেন্টার আছে সেখান থেকে এ ফেসিয়াল করালে উপকার মিলবে। ভালো জায়গা থেকে এ ফেসিয়াল করতে খরচ হবে তিন-সাত হাজার টাকা। 

সতর্কতা 

হাইড্রাফেসিয়ালে ত্বক বেশি করে এক্সফোলিয়েট করা হয়। এ কারণে ত্বক পাতলা হয়ে যায়। তাই ফেসিয়ালের পর তিন-চার দিন সতর্ক থাকতে হবে। দীর্ঘসময় রোদে থাকা কিংবা রান্নার সময় চুলার পাশে থাকা ঠিক হবে না। তবে ভিটামিন সি যুক্ত সিরাম, ক্রিম, ফেসওয়াশ ব্যবহার করলে ত্বক ভালো থাকবে। 

প্রাকৃতিক উপাদানে রূপচর্চা করলেও সাবধান থাকা জরুরি। সব উপাদান সবার ত্বকে মানায় না। কোনো কোনো প্রাকৃতিক উপাদানে তীব্র অ্যালার্জি সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। মুখ বা ত্বকের বড় অংশে কোনো প্যাক ব্যবহারের আগে কানের পেছনে বা হাতের কনুইয়ের ভেতরের অংশে সামান্য লাগিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। চুলকানি, লালচে ভাব বা জ্বালাপোড়া না হলে তবেই এটি মুখে ব্যবহার করুন। 

লেবুর রসে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক এসিড থাকে, যা ত্বকে জ্বালা তৈরি করতে পারে। লেবুর রস সবসময় পানি বা অন্য কোনো উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা উচিত।

যাদের ত্বকে ব্রণের প্রবণতা বেশি, টকদই ও কাঁচা দুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ দুধের চর্বি বা ল্যাকটিক এসিড ত্বকের পোরস বন্ধ করে ব্রণের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

হলুদের কোনো প্যাক ব্যবহারের পর রোদের আলোতে যাওয়া ঠিক নয়। নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করে গেলে ত্বক কালচে হওয়ার ভয় থাকে না। লেবুর রস, আমলকী বা সাইট্রাস জাতীয় যেকোনো ফল ত্বকে ব্যবহারের পর রোদে গেলে ত্বকে ছোপ ছোপ কালো দাগ হতে পারে। তাই সাইট্রাসযুক্ত ঘরোয়া প্যাক রাতের বেলা ব্যবহার করা ভালো।

আরও পড়ুন

×