ধ্বংসস্তূপে ক্যামেরা ধরেছেন গাজার মেয়েরা
গাজায় বিধ্বস্ত আল-নাখিল হলের সামনে প্রদর্শিত হয় সাংবাদিক রাগদা আল-বুহাইসির প্রথম ছবি ‘বিয়ন্ড সাইলেন্স’
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক বস্তা আটার জন্য মানুষ কতদূর হাঁটতে পারে? গাজায় এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে জীবন দিয়ে। ত্রাণকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে গুলিতে মরেছে মানুষ। ক্ষুধা সেখানে কেবল পেটের কষ্ট নয়। যুদ্ধের অস্ত্র। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই ১১ মিনিটের তথ্যচিত্র বানিয়েছেন তরুণ নির্মাতা মোনা আবু কাস। ছবির নাম ‘আ স্যাক অব ফ্লাওয়ার’, মানে ‘এক বস্তা আটা’।
গত ২৬ অক্টোবর মধ্য গাজার আল-বুরেইজে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় গাজা আন্তর্জাতিক নারী চলচ্চিত্র উৎসব। উদ্বোধনী দিনে দেখানো হয় ফিলিস্তিনি নারীদের বানানো পাঁচটি তথ্যচিত্র। একই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে গাজা সিনেমা একাডেমি। আয়োজনের জায়গাটি ছিল আল-নাখিল হল। হলটি এখন বিধ্বস্ত। গাজার বেশির ভাগ ভবনের মতো এটিও ইসরায়েলি আগ্রাসনে গুঁড়িয়ে গেছে। সেই ভাঙা হলের মাঠেই উৎসবের স্লোগান লেখা হয়েছে– ‘মৃত্যু থেকে জীবন গড়ছেন নারীরা’।
মোনার ছবিটি তাঁর নিজের জীবন থেকে নেওয়া। খাবারের খোঁজে মানুষের ছোটাছুটি, ত্রাণ বিতরণের জায়গায় মৃত্যুর ঝুঁকি, আটা আনতে গিয়ে হারানো প্রাণ–সবই উঠে এসেছে পর্দায়। তবে ছবিটির সবচেয়ে গভীর জায়গা অন্যখানে। খাবার ফিরে এলেও ক্ষুধার ভয় পরিবারগুলোর মন থেকে যায় না। সেই অদৃশ্য ক্ষত ধরতে চেয়েছেন মোনা। আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, বোমা, অবরোধ, ক্ষুধা আর স্বজন হারানোর ভারে চাপা পড়া গাজার প্রতিদিনের জীবনই তাঁর ছবির বিষয়। তিনি দেখাতে চান, যুদ্ধ কীভাবে মানুষের সম্পর্ক, স্বপ্ন আর আশা-প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে।
সাংবাদিক রাগদা আল-বুহাইসির প্রথম ছবি ‘বিয়ন্ড সাইলেন্স’। গল্পটি এক বধির শিল্পীর। তিনি কখনও পড়তে-লিখতে শেখেননি, ইশারা ভাষাও জানেন না। রাফায় তাঁর স্টুডিও ধ্বংস হয়েছে। মা-বাবাসহ পরিবারের কয়েকজনকে হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে দেইর আল-বালাহতে আসার পর অন্য এক পরিবার তাঁকে আশ্রয় দেয়। পরে রাস্তার পাশে গড়েন ছোট্ট এক স্টুডিও। সেখানে রং আর রেখায় তিনি আঁকেন হারানো আর উদ্বাস্তু হওয়ার কথা। মুখে যা বলতে পারেন না, ক্যানভাসে তা বলেন। রাগদা বলেন, ‘যুদ্ধে প্রতিবন্ধী মানুষের কষ্ট কয়েক গুণ বেশি। ঘর হারানো, স্বজন হারানো, জীবিকা হারানো–সব একসঙ্গে নেমে আসে তাদের ওপর। অথচ তাদের কথা সবচেয়ে কম শোনা যায়।’ তাঁর বিশ্বাস, শিল্প ভাষা আর নীরবতার দেয়াল ভাঙতে পারে।
বাকি তিনটি ছবিও যুদ্ধের ভেতরের জীবন নিয়ে। ‘সোসো: দ্য লাইফলাইন’ এক এতিম শিশু আর তার গাধার গল্প, যারা মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করে। ‘রেমন্যান্টস অব লাইট’ এক নির্মাতার কথা বলে, যিনি পরিবার আর ঘর দুটোই হারিয়েছেন। ‘দানদানা’র কেন্দ্রে রয়েছেন এক মা, যার আট সন্তান নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকা স্বজনদের নিয়ে তিনি ফিলিস্তিনি লোকগানে শোক সামলানোর পথ খোঁজেন। পাঁচটি ছবিই তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে। চলতি বছরের মার্চে শুরু হওয়া এই কোর্সে অংশ নেন ২৫ জন তরুণী। আল-কুদস ওপেন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে মিলে কোর্সটি সাজিয়েছে গাজা সিনেমা একাডেমি। এর স্বীকৃতি দিয়েছে ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা উৎসবে ২৪টি দেশের ৭৩টি ছবি দেখানো হয়।
এই চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক ইজ্জেদিন শাল্লাহর মতে, ছবিগুলোর বিষয় আলাদা হলেও সবগুলোই ব্যক্তির কষ্টকে মানুষের বড় গল্পে রূপ দিয়েছে। এ গল্পগুলো হয়তো কোনোদিন পর্দায় আসত না। এখন সেগুলো সাক্ষ্য হয়ে থাকছে।
লেবাননপ্রবাসী খ্যাতিমান ফিলিস্তিনি নির্মাতা মাই মাসরি এ উৎসবের আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলছেন, এ ছবিগুলো ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ। মেয়েরা নিজের গল্প নিজে বলছেন। তাতে জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতি বেঁচে থাকছে। একাডেমি এখন পরিবেশকদের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে; যাতে বিদেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, নারী ও মানবাধিকার ভিত্তিক উৎসবে এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ছবিগুলো দেখানো যায়।
- বিষয় :
- ধ্বংসাবশেষ