মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন
ধর্মীয় পরিচয় যখন অভিযুক্তের ঢাল
রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধর্ষণ, বলাৎকার বা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন কোনো একটি ধর্ম বা প্রতিষ্ঠানের একার অসুখ নয়। তবু ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ উঠলে আমরা অন্য রকম এক সংকটে পড়ি। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগকে তখন গোটা ধর্ম, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের অপমান বলে দেখানো হয়। মান বাঁচানোর তোড়ে চাপা পড়ে শিশুর নিরাপত্তা আর বিচারের প্রশ্ন। যে ঘরে নৈতিকতা শেখানো হয়, সেই ঘরেই জবাবদিহি সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় কর্তৃত্ব শুধু বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকে না। তার ভিত গড়ে মানুষের আস্থা, সম্মান আর আনুগত্য। তাই অনেকের চোখে একজন ধর্মীয় শিক্ষক কেবল একজন মানুষ নন, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধি। বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন এ প্রতিনিধিত্ব দায় এড়ানোর ছাড়পত্র হয়ে ওঠে। অভিযুক্তকে আগলে রাখা তখন হয়ে ওঠে ধর্মপ্রাণতা আর বিচার চাওয়া হয়ে যায় ধর্মবিরোধিতা। ক্ষমতা সব সময় লাঠি হাতে আসে না। কার কথা বিশ্বাস করা হবে, কার অভিযোগ সন্দেহের চোখে দেখা হবে, কে চুপ থাকবে, তা ক্ষমতাই ঠিক করে দেয়। শিশু যখন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, সে কেবল একজন মানুষের মুখোমুখি হয় না। তার সামনে দাঁড়ায় বয়স, কর্তৃত্ব, মর্যাদা আর প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের ভারী দেয়াল। তার কথা উড়িয়ে দেওয়া মানে তার সত্য বলার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া।
সম্প্রতি টঙ্গীতে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগ আর প্রতিবাদী বাবাকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তা এ সংকটকেই সামনে এনেছে। নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুর সুরক্ষা ও অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার–তিনটিই জরুরি। বাবার সহিংস প্রতিক্রিয়া সমর্থনযোগ্য নয়। তার দোহাই দিয়ে শিশুর অভিযোগকে গৌণ করা বা পরিবারটিকে হুমকি দেওয়ার কোনো নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই। এক অন্যায়ের বিচার আরেক অন্যায় ঢাকার অজুহাত হতে পারে না।
আলেম সমাজের কাছে তাই বিনীত প্রশ্ন রাখি। ধর্ম ব্যাখ্যার অধিকার কি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে? যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ধর্মীয় পরিচয় কেন রক্ষাকবচ হবে? ধর্মের মর্যাদা কি অভিযুক্তের প্রতি আনুগত্যে নাকি সত্য খুঁজে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসে?
আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুর খাওয়া, ঘুম, শাসন সবই শিক্ষকের হাতে। সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শকে ‘আদর’ বা ‘স্নেহ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্নেহের ভাষায় নিপীড়ন বৈধ হয় না।
অসংখ্য আলেম ও শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে শিশুর অভিযোগ গুরুত্ব পায়, কর্তৃপক্ষ স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা করে এবং অপরাধ প্রমাণ হলে পরিচয় না দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রাষ্ট্রকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা, নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
- বিষয় :
- শিক্ষা