ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ জুলাই ২০২৫

সাক্ষাৎকারে আবদুল কাদের সিদ্দিকী

বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন না

বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন না

আবদুল কাদের সিদ্দিকী

 শাহেদ চৌধুরী

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:৩৬ | আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪ | ১৫:০৯

নতুন নির্বাচন চাই আগামী বছরের শেষের দিকে। নির্বাচন বেশি দেরি করলে যারা ক্ষমতায় থাকবেন, তারা শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি নিন্দিত হবেন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু খুবই অবহেলিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতার পর এতটা ভূলুণ্ঠিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যাবে না– এ কেমন কথা! জুলাই-আগস্টে বিজয়ীদের বলব, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন না। শেখ হাসিনা এবং প্রকৃত আওয়ামী লীগকেও এক করবেন না।’ স্মৃতিসৌধে গেলে নগ্ন পায়েই যাওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। 

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি  কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না। তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি ও জাদুঘর পুড়িয়ে দেওয়াটা অসভ্যতার শ্রেষ্ঠ স্বাক্ষর। তাই প্রধান উপদেষ্টাসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উচিত ছিল, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় নিন্দা জানানো। আশা করি, তারা নিন্দা জানাবেন।’ তিনি আরও বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিজের পরিবারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ করেছিলেন শেখ হাসিনা। এটা তাঁর ব্যর্থতা। 

সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বলেছেন, সংবিধান সংস্কার করতে হলে সংসদের মাধ্যমে করতে হবে। এর বাইরে সুযোগ নেই। সরকারের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে হবে আগামী বছরের শেষের দিকে। বেশি দেরি করলে যারা ক্ষমতায় থাকবেন, তারা আমার বোনের (শেখ হাসিনা) চেয়েও বেশি নিন্দিত হবেন। আর মানুষ ভোট দিতে পারলে অনেক কিছুর সমাধান হবে। নিচে সাক্ষাৎকারের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো। 

সমকাল : কেমন আছেন?

কাদের সিদ্দিকী : একজন বীরউত্তম হিসেবে ভালো নেই। 

সমকাল : কেন?

কাদের সিদ্দিকী : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সফলতা আমার কাছে খুবই আনন্দের। কিন্তু কেন জানি, মুক্তিযুদ্ধ খুবই অবহেলিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতার পর এতটা ভূলুণ্ঠিত হয়নি। একমাত্র বাঙালি হিসেবে আমি পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করাতে তার (নিয়াজি) গুহায় গেছি। অথচ আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাদের কেউ কেউ গত ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত হওয়ার দিনে এক সমাবেশে বলেছে, বঙ্গবন্ধু ও কাদের সিদ্দিকীর নাম উচ্চারণ করা যাবে না। এ কেমন কথা! আসলে বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিয়ে ভালোবাসি, এটা মনে হয় দুর্ভাগ্যের। ভগ্নি (শেখ হাসিনা) এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। এখনও সেটা করা হচ্ছে।

সমকাল : ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে। কিছু বলবেন?

কাদের সিদ্দিকী : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অতটা সম্মানিত ও গুরুত্ব পাচ্ছে না। যারা জুলাই-আগস্টে বিজয় পেয়েছেন তাদের বলব, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন না। শেখ হাসিনা এবং প্রকৃত আওয়ামী লীগকেও এক করবেন না। 

সমকাল : জুতা পায়ে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : স্মৃতিসৌধে গেলে নগ্ন পায়েই যাওয়া উচিত। আমি নগ্ন পায়েই শ্রদ্ধা জানাতে যাই। মহান বিজয় দিবসেও শ্রদ্ধা জানাতে নগ্ন পায়েই যাব। 

সমকাল : এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক ছিল কালো কাপড়ে ঢাকা। সেখানে লেখা ছিল, শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিস্থল। এ নিয়ে কিছু বলবেন?

কাদের সিদ্দিকী : এত ছোট বিষয় আমাকে তাড়িত করে না। বড় বড় বিষয় তাড়িত করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে জাতির পিতা জিয়াউর রহমান। এটা ঠিক না। আর যে কারণে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণরোষ হয়েছিল, তা যদি বিএনপি করে তাহলে তো একই জিনিস হবে। 

সমকাল : মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে কি মনে করেন?

কাদের সিদ্দিকী : না। পাকিস্তানের ২২ পরিবার থেকে মুক্তি পেতে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেখানে হয়েছে ২২ হাজার পরিবার। পাকিস্তানিরা আমাদের ভোটের অধিকারের মর্যাদা দেয়নি। স্বাধীন দেশেও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। অথচ মানুষ ভোট দিতে পারলে অনেক কিছুর সমাধান হবে।

সমকাল : আপনি কি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের নামে গত আওয়ামী লীগ সরকার বাড়াবাড়ি করেছে?

কাদের সিদ্দিকী : অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করেছে। গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনার বেলায় অনেক বাড়াবাড়ি করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সব মানুষের শ্রদ্ধার আসনে নিতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুকে নিজের পরিবারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। এটি তাঁর ব্যর্থতা। 

সমকাল : গণঅভ্যুত্থানের দিনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর একটি ঐতিহাসিক বাড়ি। সেই বাড়িটিকে পুড়িয়ে দেওয়াটা অসভ্যতার শ্রেষ্ঠ স্বাক্ষর হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের প্রধান নেতা। তাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না। তাই প্রধান উপদেষ্টাসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উচিত ছিল, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় নিন্দা জানানো। আশা করি, তারা নিন্দা জানাবেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়ির সামনে গেলেই বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এটা ভালো না। এসবের পরিণতি সর্বক্ষেত্রে শুভ হয় না। অশুভ হয়। 

সমকাল : সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : গণঅভ্যুত্থানকে বিপ্লব হিসেবে ধরা হলে যা কিছু করা যেত; কিন্তু এটি বিপ্লব নয়। সুতরাং সংবিধান সংস্কার করতে হলে সংসদে নির্বাচিত এমপিদের মাধ্যমে করতে হবে। এর বাইরে কোনো সুযোগ নেই। 

সমকাল : সংস্কারের পর নির্বাচন নাকি নির্বাচনের পর সংস্কার?

কাদের সিদ্দিকী : শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক সংস্কারগুলো নির্বাচনের আগে চাই। নতুন নির্বাচন চাই আগামী বছরের শেষের দিকে। নির্বাচন বেশি দেরি করলে যারা ক্ষমতায় থাকবেন, তারা আমার বোনের (শেখ হাসিনা) চেয়েও বেশি নিন্দিত হবেন। 

সমকাল : শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : এর আগে কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। তাঁকে (শেখ হাসিনা) মায়ের মতো ভালোবাসি। কিন্তু দেশ পরিচালনায় তাঁর কর্মকাণ্ডে সমর্থন ছিল না। আর তাঁর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি চরম কলঙ্কের। 

সমকাল : ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেন হলো? 

কাদের সিদ্দিকী : মানুষের অসন্তুষ্টিই গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র কারণ। 

সমকাল : আওয়ামী লীগের সংকটকালে দলের দায়িত্ব নিতে বললে কী করবেন? 

কাদের সিদ্দিকী : এ বিষয়ে কথা বলার সময় এখনও আসেনি। 

সমকাল : একজন বীরউত্তম হিসেবে সরকার ও জাতির উদ্দেশে কিছু বলবেন?

কাদের সিদ্দিকী : সরকারের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে হবে। মানুষ যা চায়, নির্বাচনী সংস্কারে তা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে মানুষের সম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হবে। ঘুষ ও দুর্নীতি তাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন

×