ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রহস্যময় স্পিনার তারিক

রহস্যময় স্পিনার তারিক
×

ছবি- এপি

তরিকুল ইসলাম রাজন

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪৬

বোলার দৌড়ে আসছেন, ক্রিজের একদম কাছে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। ব্যাটসম্যান বিভ্রান্ত, আম্পায়ারও হয়তো ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেন। এরপরই হাত ঘুরে বল আছড়ে পড়ল উইকেটে। ব্যাটসম্যানের বোঝার আগেই সব শেষ। অনেকদিন ধরেই পাকিস্তানের ক্রিকেটে নিয়মিত এই দৃশ্য। এই দৃশ্যের নায়ক পাকিস্তানের স্পিনার উসমান তারিক; যাকে ক্রিকেটবিশ্ব এখন চেনে ‘মিস্ট্রি স্পিনার’ হিসেবে। তবে উসমান তারিকের গল্পটা শুধু ২২ গজের অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশনের নয়। এটি দুবাইয়ের লেবার ক্যাম্পের এক শ্রমিকের বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার গল্প। এটি এমএস ধোনির বায়োপিক দেখে জীবন বদলে ফেলার গল্প।

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার নওশেরার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা উসমানের জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০০৭ সালে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে কাঁধে চাপে সংসারের ভার। জীবিকার তাগিদে কিশোর বয়সেই পাড়ি জমান দুবাইতে। সেখানে একটি হোটেলে কাজ নেন, যেখানে দিনের পর দিন তাকে পেঁয়াজ কাটতে হতো। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে এই কাজ করতে গিয়ে পিঠে অসহ্য ব্যথা হতো তার। কাজ ছেড়ে ফিরে আসেন পাকিস্তানের পেশোয়ারে।

এরপর কাজিন হাসিবের ডাকে যান আফগানিস্তানের কাবুলে। সেখানে হাড়কাঁপানো শীতে মাইনাস ১০-১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় টিকে থাকা ছিল আরেক যুদ্ধ। কাজ না পেয়ে মাত্র তিন সপ্তাহ থেকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয় দেশে। এরপর ইসলামাবাদে কায়িক শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

২০১৬ সালে আবারও দুবাইয়ে যান। আশ্রয় হয় সোনাপুরের এক লেবার ক্যাম্পে, যেখানে এক রুমে ২০ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতেন। পরে একটি কোম্পানিতে লজিস্টিকস অফিসারের কাজ পান। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও মন পড়ে থাকত ২২ গজে। উসমানের দরজায় আরেকটি জীবন বদলে দেওয়ার মুহূর্ত হাজির হয় ২০১৬ সালের অক্টোবরে। সেবার দুবাইতে প্রতিভা অন্বেষণে যায় পেশোয়ার জালমি। উসমানের বোলিং দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তানে ম্যাচ খেলার প্রস্তাব দেয়। যদিও চাকরি হারানোর ভয়ে সেবার জালমিকে না বলেছিলেন তিনি।

২০১৭ সালের এক রাতে বন্ধু হাসিবের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে খেতে ধোনির বায়োপিক ‘এমএস ধোনি: দি আনটোল্ড স্টোরি’ দেখছিলেন উসমান। সেই দৃশ্য দেখে উসমান তাঁর কাজিনকে বলেছিলেন, ভাই, আমার ঘটনাও তো ঠিক এমনই। সেই এক রাতেই বদলে যায় উসমানের জীবনের গতিপথ। সিদ্ধান্ত নেন, দুবাইয়ের প্রবাস জীবন ছেড়ে তিনি ফিরবেন ক্রিকেটে।

দেশে ফিরে নওশেরা ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন উসমান। সেখানে নেটে ইফতিখার আহমেদকে বল করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি। বিভিন্ন ক্লাব থেকে ডাক পেতে শুরু করেন। ম্যাচপ্রতি ৫০০ থেকে ১৫০০ রুপি পেতেন, যা দিয়ে তাঁর বাইকের তেল খরচ চলত। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিশ্বকাপে ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। 

উসমানের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরন গ্রিন এবং ইংল্যান্ডের টম ব্যাটন তাঁর বিরুদ্ধে চাকিংয়ের অভিযোগ তুলেছিলেন। আম্পায়াররাও তাঁকে সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের জন্য রিপোর্ট করেছিলেন। তবে উসমান দমে যাননি। এসব বিতর্ক গায়ে মাখেন না। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমি থ্রো করছি না, আমার কনুইয়ের হাড়ের গঠনগত কারণে এমন মনে হয়।’ আইসিসির বায়োমেকানিক্যাল টেস্টে দুবার তাঁর অ্যাকশন বৈধ প্রমাণিত হয়েছে। রবিচন্দ্রন অশ্বিন এবং উসমান খাজার মতো তারকারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।

চলমান টি২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে ধরা হচ্ছে অন্যতম ফেভারিট, আর সেই দলের তুরুপের তাস এই উসমান তারিক। উপমহাদেশের কন্ডিশনে তাঁর মতো রহস্যময় স্পিনাররা সবসময় ভয়ংকর। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে নিয়ে আলাদা ছক কষেছে পাকিস্তান।

উসমান তারিক কি লম্বা রেসের ঘোড়া, নাকি ক্ষণিকের চমক তা সময় বলে দেবে। তবে যিনি এত প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলার সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

×