চীনের শ্রেষ্ঠত্বে এশিয়ান গেমসের সমাপনী
নাগোয়া, জাপান থেকে সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:১৫ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:২৩
নাগোয়ার আকাশ তখন ২০তম এশিয়ান গেমস সমাপনীর আতশবাজির আলোয় মাখামাখি। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে, ১৬৯টি স্বর্ণপদক পকেটে পুরে চীন যখন অট্টহাসি হাসছে, তখন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক– ওরা বোধহয় এই গ্রহের অ্যাথলেট নন! একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই উৎসব দেখছিল স্বাগতিক জাপান, দ্বিতীয় স্থান নিয়েও যাদের চোখে ছিল সমীহ। আর একটু তাকালেই চোখে পড়ত এক নতুন ভারতের মহোত্থান, দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়ে যারা বুক চিতিয়ে দাপট দেখাল টপ টেনের অলিন্দে। অথচ ঠিক সেই গৌরবগাথার পাশেই পড়ে রইল এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস। নাম তার বাংলাদেশ।
একটি মাত্র ব্রোঞ্জ নামের সান্ত্বনা পুরস্কার বগলে চেপে, তালিকায় ৩৭ নম্বরের তলানিতে বসে অ্যাথলেটরা যখন দেশের বিমান ধরছেন, তখন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল– পরিকল্পনাহীনতার চাদর মুড়ি দিয়ে বড় মঞ্চে শুধু হতাশার গল্পই লেখা যায়। বাকিরা যখন পদকের খনি খুঁড়ছে, বাংলাদেশ তখন কেবলই শূন্যতা আর আক্ষেপের খতিয়ান মেলাচ্ছে। অপেক্ষা তাদের চার বছর পর ফের দোহা এশিয়ান গেমসের।
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ঐতিহ্য বজায় রেখেই পুল ও ট্র্যাকে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে শক্তিশালী চীন। তবে গত আসরের (হাংঝু ২০২৩, যেখানে তারা রেকর্ড ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক পেয়েছিল) তুলনায় ঘরের মাঠের সেই অবিশ্বাস্য সংগ্রহকে এবার ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তা সত্ত্বেও দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত যে কোনো এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে এবারই নিজেদের সেরা সাফল্য (১৬৯টি স্বর্ণসহ মোট ৩৪১টি পদক) অর্জন করেছে তারা, যা ২০০৬ সালের দোহা গেমসের (১৬৫টি স্বর্ণ) রেকর্ডকে টপকে
সুইমিংপুলে চীন একাই রেকর্ড ৩০টি স্বর্ণ জেতে, যেখানে মাত্র ১৩ বছর বয়সী উদীয়মান সাঁতারু ইউ জিদি মেয়েদের ২০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মিডলেতে এশিয়ান রেকর্ড এবং ২০০ মিটার বাটারফ্লাই ও ৪০০ মিটার ইন্ডিভিজুয়াল মিডলেতে গেমস রেকর্ড গড়ে গেমসের সেরা নারী ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হন। এ ছাড়া শুটিংয়ের স্কিট মিক্সড টিম ইভেন্টে লিউ জিয়ানলিন ও জিয়াং ইটিং ৫২ স্কোর করে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছৈন।
বাংলাদেশের প্রত্যাশার পারদটা চড়েছিল চেনা ডেরাতেই– ক্রিকেট, কাবাডি, আরচারি কিংবা শুটিং। আশা ছিল, এই চেনা মঞ্চগুলো থেকেই অন্তত লড়াইয়ের কিছু রসদ মিলবে। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরু হতেই দেখা গেল দলগত কিংবা ব্যক্তিগত, প্রতিটি ইভেন্টেই বাংলাদেশ উপহার দিল চরম হতাশার এক নিষ্প্রাণ প্রদর্শনী। বরাবরের মতোই অ্যাথলেটদের একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে রইল গায়ে জড়ানো লাল-সবুজ পতাকাসংবলিত সেই ব্লেজারটি; যা কেবলই এক আন্তর্জাতিক সফরের স্মারক হয়ে ট্রাঙ্কবন্দি হওয়ার যোগ্য। তবে এই ভরাডুবি এবার আর সহজে পার পাচ্ছে না।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত করতে এরই মধ্যেই একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘এশিয়ান গেমসে এবারের পারফরম্যান্স অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল। ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য এরই মধ্যে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের বর্তমান লক্ষ্য কেবল কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা নয়, বরং সরাসরি পদকের জন্য লড়াই করা।’ অর্থাৎ শুধু ‘ট্যুরিস্ট’ হয়ে বড় মঞ্চে মার্চ-পাস্ট করার দিন যে ফুরিয়েছে, সেই কড়া বার্তাটা এবার টেবিল থেকেই দিয়ে দেওয়া হলো।
প্রতিবেশী ভারত এবার জিতেছে মোট ৮৫টি পদক (২১টি স্বর্ণ, ২৭টি রৌপ্য এবং ৩৭টি ব্রোঞ্জ)। তারা ক্রিকেট (নারী দল), কাবাডি (পুরুষ ও নারী দল), আরচারি এবং হকির মতো প্রধান ইভেন্টগুলোতে স্বর্ণ জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা পুরুষ জ্যাভলিন থ্রোতে স্বর্ণ পাওয়ার পাশাপাশি নারী ক্রিকেটে জিতেছে রুপা। পাকিস্তান পুরুষ ক্রিকেটে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে হেরে রুপা জেতার পাশাপাশি মোট ১০টি পদক নিয়ে মাঠ ছেড়েছে, আর নেপালও নিজেদের ঝুলিতে পুড়েছে দুটি ব্রোঞ্জ। অথচ এই তুলনাতেই ফুটে ওঠে বাংলাদেশের করুণ চেহারা। একমাত্র প্রদীপ হয়ে জ্বলেছেন নারী উশু অ্যাথলেট জিন্নাত আক্তার।
- বিষয় :
- এশিয়ান গেমস
- খেলা