ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

বিস্ময় বালকে শুরু, কিংবদন্তিতে সমাপ্তি

বিস্ময় বালকে শুরু, কিংবদন্তিতে সমাপ্তি
×

বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২১ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন লিওনেল মেসি

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০২ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০২

ফুটবল মহাকাব্যের শেষ পাতায় এসে যখন জাদুকর তাঁর রাজদণ্ডটি নামিয়ে রাখতে চলেছেন, তখন চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা ফুটবল-গ্রহে। রোজারিওর সেই শীর্ণকায়, হরমোনজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত এক বিস্ময়-কিশোর (সুপার কিড); যাঁর পায়ে বল ছোঁয়ালেই মনে হতো কোনো এক অস্পৃশ্য জাদুর স্পর্শ লেগেছে, তিনিই কিনা একদিন শ্রেষ্ঠতম ফুটবলার ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অব অলটাইম) হয়ে বুয়েন্স আয়ার্সের প্রিয় উঠানে সমাপ্তি টানছেন তাঁর আপন খেলাটির। 

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে হয়তো তাঁর সেই দীর্ঘ-কণ্টকাকীর্ণ অভিযাত্রার যবনিকাপাত ঘটবে বেনিনের বিপক্ষে এই শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি দিয়ে। কিন্তু মানব চরিত্রের এক অলঙ্ঘ্য আলোকবর্তিকা হিসেবে তিনি রেখে যাচ্ছেন এমন কিছু জীবনদর্শন, যা কালান্তরকেও স্তব্ধ করে দেয়। নিকটজনের ছুড়ে দেওয়া সংশয়ের বিষাক্ত বাণ বুকে ধারণ করেও কীভাবে হিমালয়সম অবিচলতায় ঘুরে দাঁড়ানো যায়, সেই মহতী পাঠ আজ মেসির জীবনের শ্রেষ্ঠতম উত্তরাধিকার।

ক্যারিয়ারের প্রায় প্রথম এক দশক আন্তর্জাতিক শিরোপা অধরা রয়ে গিয়েছিল তাঁর কাছে। বছরের পর বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির চাপ দ্বিগুণ হয়েছে। বার্সেলোনার হয়ে অপ্রতিরোধ্য সাফল্যের বিপরীতে জাতীয় দলের জার্সিতে একটানা ট্রফিহীনতা– মেসির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পথে এটিই ছিল সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ২০১৬ সালের জুনে কিংবদন্তি পেলের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুখ ফুটে বলেই ফেলেছিলেন ম্যারাডোনা, ‘মেসি খুব ভালো একজন মানুষ, কিন্তু তার নিজস্ব কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। একজন আদর্শ নেতা হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব অন্তত তার মধ্যে নেই।’ 

ম্যারাডোনা-পরবর্তী যুগে ১৯৯৩ সালের পর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা না পেয়ে হাহাকার করছিল তখন আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার সেই কড়া মন্তব্য মেসির মনে তীব্রভাবে গেঁথে গিয়েছিল। সেই ট্রফিহীন ২৩ বছরের মধ্যে পূর্ণ ১০টি বছরই দলে ছিলেন মেসি। সেটি ছিল এক দশকের বেশি সময় ট্রফির একদম কাছাকাছি পৌঁছেও তা ছুঁতে না পারার গভীর যন্ত্রণার এক ইতিহাস। ২০১০ সালে ম্যারাডোনার কোচিংয়ে বিশৃঙ্খল আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে ঘটে ভরাডুবি। সেবার মেসিকে কার্যত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার বানিয়ে কার্লোস তেভেজের জন্য বল বানিয়ে দেওয়ার কাজ সোপর্দ করা হয়েছিল। 

২০১৪ সালে অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর একাই রক্ষণাত্মক ও ধারহীন এক দলকে টেনে মারাকানার ফাইনালে নিয়ে যান মেসি। কিন্তু অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার ইনজুরির কারণে একা হয়ে পড়া মেসির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ফাইনালের মঞ্চেই চুরমার হয়ে যায়। এর পরের ইতিহাস আরও নির্মম। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দুটি টানা কোপা আমেরিকার ফাইনালে উঠেও চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হার মানতে হয় আর্জেন্টিনাকে। সব মিলিয়ে মেসি নিজেও নিজের ওপর বিরক্ত ছিলেন, ‘আমি লোকজনকে বলতে শুনি–মেসি দেশের জার্সির টান অনুভব করে না কিংবা সে দৌড়ায় না। কিন্তু ফুটবল তো শুধু গায়ের জোর দেখানোর খেলা নয়! ফুটবল তো এভাবে খেলা হয় না।’ ২০১৫ সালে টিওয়াইসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসির বক্তব্যের সুর ছিল স্পষ্ট, ‘ফুটবল একটি খেলা, কৌশল নিয়ে কথা না বলে আমরা কেন অযথা এসব আবেগ নিয়ে পড়ে আছি?’

মেসির এই মনের কথাটিই পড়তে পেরেছিলেন লিওনেল স্কালোনি। ‘তুমি ম্যারাডোনা নও, তুমি মেসি। আর আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।’– স্কালোনির সেই যুগান্তকারী মাস্টারপ্ল্যান। কোচ লিওনেল স্কালোনি জাতীয় দলকে মেসির উপযোগী করে যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন, তা পেপ গার্দিওলাও কখনও নিজের দলের ক্ষেত্রে করতে পারেননি। মেসির পুরোনো সতীর্থদের প্রায় সবাইকে ছেঁটে ফেলা হয়; ২০২২ বিশ্বকাপ দলে টিকে ছিলেন শুধু নিকোলাস ওতামেন্দি, আলেহান্দ্রো গোমেজ ও একমাত্র ডি মারিয়া। দলে জায়গা পান নিজেদের সেরা ফর্মে থাকা কিছু অভিজ্ঞ যোদ্ধা ও উদীয়মান কিছু তরুণ, যাদের সবার মধ্যেই একটি সাধারণ মিল ছিল– তারা সবাই ছিলেন মেসির একনিষ্ঠ ভক্ত। 

প্রতিবার শূন্য থেকে অলৌকিক কিছু ঘটানোর জন্য মেসির ওপর চাপ না দিয়ে স্কালোনি জোর দিয়েছিলেন বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর। তিনি মেসিকে মাঠজুড়ে তাঁর নিজস্ব পরিচিত ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়ানোর স্বাধীনতা দেন। মাঠের কোনো নির্দিষ্ট পজিশনে কখনোই মেসিকে শিকলবন্দি করা হয়নি; মাঠজুড়ে তিনি কোথায় খেলবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল সম্পূর্ণ তাঁর। আর বাকি সবাই নিজেদের মানিয়ে নিতেন মেসির কৌশল অনুযায়ী। দলের পরিবর্তনের পাশাপাশি মেসি নিজেও বদলে গিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে।

আরও পড়ুন

×