মিরপুরে গুরু-শিষ্যের লড়াই
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:৩৯
ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে দলটি দ্বিতীয়বারের মতো টি২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল ২০১৬ সালে ড্যারেন স্যামির নেতৃত্বে, সেই দলের কোচ ছিলেন ফিল সিমন্স। তাই সম্পর্কে তারা গুরু-শিষ্য। কালের পরিক্রমায় সম্পর্কের এ গতিপথ বদলে গেছে। এখন তারা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামি আর ফিল সিমন্স বাংলাদেশের প্রধান কোচ। একটা সময়ে তারা দুজন যেখানে একই লক্ষ্যে কাজ করতেন, আজ তাদের সব পরিকল্পনা থাকবে নিজ নিজ দলকে জয়ী করতে। ড্রেসিংরুম সামলানো, গেম প্ল্যান দেওয়া এবং জয়-পরাজয়ের ছক কষবেন পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে। তাই বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজটিকে গুরু-শিষ্যের লড়াইও বলা যায়।
গতকাল সোমবার উভয় দলের কোচ সংবাদ সম্মেলনে এসে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা বলতে। সিমন্সের আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার ঘোষণা দেন স্যামি। সংবাদ সম্মেলন শেষে ক্যারিবীয় কোচকে একজন সাংবাদিক বলেন, ‘খেলা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, কিন্তু জিতবে বাংলাদেশ।’
রসিকতা বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছাড়েন স্যামি। এই চ্যালেঞ্জের কথা টাইগার কোচকে বলার পর হেসেছিলেন তিনিও। বাংলাদেশের কোচ যেতে যেতে বলেন, ‘হোপ ফর দ্য বেস্ট।’ সিমন্স স্বরগ্রাম নিচে রেখে কথা বলতে পছন্দ করেন। সংবাদ সম্মেলনে কঠিন প্রশ্নের উত্তরও ঠান্ডা মাথায় দেন নিচু স্বরে। গতকালের অফিসিয়াল সংবাদ সম্মেলনেও ছিলেন ‘কুল’। বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা থাকায় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় ছিলেন কৌশলী।
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট সিরিজে হারাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত– জানতে চাওয়া হলে কোচ বলেন, ‘আমরা সেরা ক্রিকেট খেলার জন্য প্রস্তুত।’ তিনি ভালো করেই জানেন সেরা ক্রিকেট খেলে অনেক সময় ম্যাচ জেতা যায় না। যে কোনো ভালো দলের বিপক্ষে ম্যাচ জিততে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখাতে হয় পেশাদারিত্ব। টেস্ট ক্রিকেটে নাজমুল হোসেন শান্তদের মাঝে সেই মেজাজ দেখতে পান কোচ। দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে আর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোয় আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর ক্রিকেটারদের। ওই আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে হোম সিরিজটি জিততে চাওয়া স্বাভাবিক। যদিও সিমন্স ভালো ক্রিকেট খেলতে চেয়ে লক্ষ্যের কথা বোঝালেন পরোক্ষে।
উইন্ডিজের বিপক্ষে খেলার প্রস্তুতি ভালো বলে দাবি সিমন্সের। তাঁর মতে, ‘আমরা সেরা ক্রিকেট খেলার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ঘরের মাঠে শেষ দুটি টেস্ট সিরিজে ভালো খেলেছে। তারা সদ্য ভারতে ওয়ানডে ও টি২০ সিরিজ খেলেছে। তাদের খেলোয়াড়রা খেলার মধ্যেই ছিল। এই সিরিজটি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে। তবে আমরা আমাদের সেরাটা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আগামীকাল বুধবার শুরু প্রথম টেস্ট। এই সিরিজের জন্য কঠিনভাবে প্রস্তুত হয়েছে স্যামির দল। চেন্নাইয়ে শ্রীধরণ শ্রীরামের অধীনে ১০ দিনের কন্ডিশনিং ক্যাম্প করেছে চেন্নাই একাডেমিতে কালো মাটির উইকেটে। ১৯ অক্টোবর ঢাকায় এসে অনুশীলনের পাশাপাশি দুই দিনের গা গরমের ম্যাচও খেলেছে তারা। সেখানে ১৫ জন ক্রিকেটারকে নিয়ে একসঙ্গে অনুশীলন করতে গতকাল সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এর পরও কোচ খুশি, ‘আমি খুশি কারণ যারা এখানে আগে থেকে ছিল, তারা তাদের দায়িত্বগুলো ঠিকঠাক পালন করেছে। এখন আমাদের হাতে দুই দিন সময় আছে, এই সময়ে যারা সাদা বলের (ওয়ানডে ও টি২০) ক্রিকেট খেলছিল, তারা দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। আমরা সবাই মিলে দুই দিনে সবকিছু গুছিয়ে নেব।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট বোর্ডের অর্থনৈতিক সংকটের কথা কে না জানে। এই আর্থিক অনটনের প্রভাব ক্রিকেটারদের রুটিরুজিতেও পড়েছে। তাই বোর্ডের আয় বাড়াতে পরোক্ষে একাট্টা হয়েছেন ক্যারিবীয় ক্রিকেটাররা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে ওপরের দিকে থাকলে আইসিসি থেকে বেশি প্রাইজমানি পাওয়া যায়। এ কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ জিতে পয়েন্ট টেবিলে জাম্প করতে চায় তারা। টি২০ ক্রিকেটের ফেরিওয়ালারা টেস্ট ক্রিকেটকেও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে জানান কোচ স্যামি, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে আমরা কোথায় থাকতে চাই, তা নিয়ে আমরা শুরু থেকেই সচেতন। অস্ট্রেলিয়ার সিরিজের আগে বার্বাডোজে আমরা বলেছিলাম যে, বাংলাদেশ সিরিজ শেষে আমরা যেন পয়েন্ট টেবিলে একটি ভালো অবস্থানে থাকতে পারি। তাই এই দুটি টেস্ট ম্যাচকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি।’
এ কারণে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল ক্যারিবীয় ক্রিকেট বোর্ড। স্যামি বলেন, ‘ভালো প্রস্তুতি নিলে ভালো পারফর্ম করার সেরা সুযোগটি তৈরি হয়— আমি এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এই সিরিজের আগে আমি দেখছি যে ছেলেরা বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত হয়েছে; আশা করি, এই প্রস্তুতি মাঠের পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হবে।’ বোঝাই যাচ্ছে, সম্প্রতি মাঠে ও মাঠের বাইরের ইস্যুতে এলোমেলো হওয়া বাংলাদেশ দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।