ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

অনুর্ধ্ব ১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভাল

‘ই’ টায়ারে রানার্স আপ, টুর্নামেন্টে ১৩০ তম

‘ই’ টায়ারে রানার্স আপ, টুর্নামেন্টে ১৩০ তম
×
×

ছবি- বাফুফে

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৮:১৫

ফুটবল আর ম্যাজিকের মধ্যে একটা মিল আছে। দুটোতেই যা দেখা যায় বা দেখানো হয়, আসল সত্যটা তার চেয়ে আলাদা হতে পারে। ‘চোখের ভ্রম’ উপহার দিতে পারে। যেমনটা হয়েছে আজারবাইজান থেকে ফেরা কিশোর ফুটবলারদের নিয়ে। ফিফা অনুর্ধ ১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভালের ‘ই’ টায়ারে রানার্সআপ হয়েছে বাংলাদেশ, অবশ্যই বড় অর্জন। কিন্তু সারাবিশ্বের শিশুদের নিয়ে ফিফার এই উৎসবের চড়া আলোর নিচেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম কৌতুক। বাফুফে মিডিয়াতে যে সংবর্ধনা কার্ডটি পাঠিয়েছে, তাতে লেখা—‘ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ এবং ফেস্টিভ্যালের রানার্সআপ বাংলাদেশ’। এই লাইনটা পড়ার পর দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমী যদি ভাবেন, বয়স ভিত্তিক এই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে বুক চিতিয়ে লড়াই করে বাংলাদেশ রানার্সআপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরেছে, তবে কি খুব অপরাধ হবে?

অথচ সত্যের খেরোখাতা খুললে দেখা যাবে এক অদ্ভুত ‘অপটিক্যাল ইলিউশন’। ১৮৯টি দেশের মেলা বসেছিল বাকুতে। সেখানে নিখাদ সত্যটা হলো, বাংলাদেশ হয়েছে ১৩০ নম্বর! আসল ট্রফি, আসল বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেছে স্পেনের শিশু–কিশোররা, আর রানার্সআপ হয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র। তারা খেলেছে ‘টায়ার-এ’ অর্থাৎ প্রথম শ্রেণিতে। আর বাংলাদেশের কিশোরেরা বুক চিতিয়ে লড়েছে ‘টায়ার-ই’ অর্থাৎ পঞ্চম স্তরে ! যেখানে তারা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যায়। এমনকি আমাদের পরশি ভারতও ‘টায়ার-সি’-তে খেলে বিশ্বমঞ্চে ৮৭ নম্বর আসনটি দখল করে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে।

যদিও রাতুল, পাভেল, তাকিবদের কৃতিত্বকে খাটো করার সাধ্য নেই। পর্তুগাল কিংবা ওয়লসের দেশের কিশোরদের চোখের দিকে চোখ রেখে লড়ার যে অসমসাহস তারা দেখিয়েছে, তা অবশ্যই কুর্নিশ পাওয়ার যোগ্য। মন্টেনেগ্রোকে চার গোল দেওয়া কিংবা গ্যাবনের বিপক্ষে সেই জয়ী গোলটি আমাদের মনে আজীবন থাকবে। কিশোরদের এই লড়াই রূপকথাকেও হার মানায়।

কিন্তু প্রশ্নটা কিশোরদের নিয়ে নয়, প্রশ্নটা বাফুফের সংস্কৃতি নিয়ে। ১৩০ নম্বর হয়েই যদি বাফুফে কর্তাদের সন্তুষ্টির পারদ এত উঁচুতে চড়ে যায়, তবে তো ভয় হয়! এই সস্তা আত্মতুষ্টি যদি কিশোরদের মগজেও ঢুকে পড়ে, তবে সেরা পঞ্চাশে আসার ক্ষুধাটাই তো মরে যাবে। পঞ্চম স্তরের রানার্সআপ ট্রফিটাকে যদি ‘গোটা বিশ্বকাপের রানার্সআপ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার এই চতুর চেষ্টা বন্ধ না হয়, তবে আমাদের ফুটবল ওই বাফুফের দেওয়া কার্ডের ভেতরেই বন্দি থাকবে। মাঠের সবুজ ঘাসে আর কোনোদিন আসল ট্রফির ছোঁয়া পাওয়া হবে না।

‘আগে এসব দলের বিপক্ষে খেলার নাম শুনলে আতকে উঠতাম। কিন্তু কিশোররা তাদের বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়েছে। তারা এখন বিশ্বকাপ ছিনিয়ে আনার সাহস রাখে।’ মঙ্গলবার ফিফা অনুর্ধ ১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভাল টুর্নামেন্টের ‘ই’ টায়ারে রানার্স আপ দলকে সম্বর্ধনা দিতে গিয়ে এমনটাই বলেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আওয়াল। আজারবাইজান থেকে দেশে ফেরার পর তাদের প্রত্যেকেকে এক লাখ করে টাকাও দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। আগামীবার এই একই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের মেয়েরাও অংশ নেবেন। সেখানেও সাফল্যের ধারা হয়ত অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ফিফা এই টুর্নামেন্টটাকে ঠিক ‘লড়াই’ বা ‘বিশ্ব জয়ের’ মঞ্চ হিসাবে দেখেছে না।

ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের পেছনে ফিফার মূল লক্ষ্য ছিল ট্রফি জয়ের তীব্র প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলকে জাগিয়ে তোলা এবং তরুণ প্রতিভাদের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম দেওয়া। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই টুর্নামেন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল—যেসব দেশ সাধারণত বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পায় না, তাদের কিশোর খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা দেওয়া, বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন ঘটানো এবং একট এক সাইড (প্রতি দলে ৮ জন করে ফুটবলার) ফরম্যাটের মাধ্যমে মাঠে তাদের ফুটবলীয় দক্ষতার সর্বোচ্চ বিকাশ নিশ্চিত করা। প্রথাগত বিশ্বকাপের মতো নকআউট পর্বে হেরে দলগুলোকে বিদায় করে দেওয়ার পরিবর্তে স্তরভিত্তিক (টায়ার) ফরম্যাট রাখার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যেন প্রতিটি দল শেষ দিন পর্যন্ত সমশক্তির প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে ফুটবল খেলাটি উপভোগ করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার সমান সুযোগ পায়।

সেই সুযোগটা পেয়েছে বাংলাদেশও। প্রাথমিক গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল ও বুরুন্ডির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে হারলেও, ওয়েলস এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো ফুটবল পরাশক্তিদের সঙ্গে বুক চিতিয়ে ড্র করে বাংলাদেশ। এরপর টায়ার-ই বা পঞ্চম স্তরের নকআউট পর্বে শুরু হয় লাল-সবুজের অপ্রতিরোধ্য যাত্রা। সিশেলস ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে পরপর দুটি শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে বাংলাদেশের গোলরক্ষক পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে পেনাল্টি সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের দল মন্টেনেগ্রোকে ৪-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেওয়া, সেমিফাইনালে গ্যাবনের বিপক্ষে নাঈমুর রহমান রাতুলের জয়সূচক ১-০ গোলের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। যদিও ফাইনালে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হেরে ট্রফি হাতছাড়া হয়, যেখানে সান্ত্বনাসূচক একমাত্র গোলটি আসে তকিবের পা থেকে; তবুও রাতুল, পাবেল ও তাকিবদের এমন চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জুগিয়েছে।

আরও পড়ুন

×