ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

স্টার্টআপ

বুয়েট শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনা সোনেরা কিনল অ্যাপল

বুয়েট শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনা সোনেরা কিনল অ্যাপল
×
×

টেকলাইফ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৮

মানব মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে পারদর্শী এমন নন-ইনভেসিভ (শরীরে কোনো যন্ত্র প্রবেশ না করে) সেন্সর প্রযুক্তি নিয়ে সফল হওয়া স্টার্টআপ সোনেরা কিনে নিয়েছে অ্যাপল। চলতি বছরের শুরুতে এর অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য বলছে, এরই মধ্যে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।

সোনেরার সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. সায়েফ সালাহউদ্দিন। উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যাপলের পরিধানযোগ্য ডিভাইস ও চিন্তার মাধ্যমে যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত হবে।

অ্যাপল ইনসাইডার রিপোর্ট বলছে, ভবিষ্যতের অ্যাপল ঘড়ি ছাড়াও মানব শরীরে পরিধানযোগ্য ডিভাইসে এই চিপ ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে স্নায়ু ও পেশিজনিত সমস্যার নিয়মিত পর্যবেক্ষণে এ ধরনের সেন্সর সহায়ক হবে। 

শরীরে কোনো যন্ত্র স্থাপন না করেই মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হলে চিন্তার মাধ্যমে কয়েকটি ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মানোন্নয়ন করা সম্ভব হতে পারে। এই প্রযুক্তি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক হবে।

২০১৮ সালে নিশিতা ডেকা ও ডমিনিক লাবানোস্কি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে শিক্ষার্থী থাকাকালে স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক সায়েফ সালাহউদ্দিন ছিলেন লাবানোস্কির পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক। পরে তিনজন মিলেই গবেষণা সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বিশেষ হিউম্যান চিপ

শুরুতে এর নাম ছিল সোনেরা ম্যাগনেটিকস। প্রথম ধাপে ২০২৩ সালে স্টার্টআপটি এক কোটি ১০ লাখ ডলারের অনুদান পায়। এর প্রথম উদ্ভাবনা ছিল পেশির নড়াচড়া শনাক্ত করার জন্য তৈরি বিশেষ চিপ ‘এসওয়ান’। উদ্ভাবকদের দাবি, একই প্রযুক্তি মানব মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। কৃত্রিম পদ্ধতিতে অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি পরিধানযোগ্য ডিভাইসের জন্য বিশেষ কর্মক্ষম হবে।

বুয়েট থেকে বার্কলে ল্যাব

২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সায়েফ সালাহউদ্দিন স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। চৌম্বকীয় সেন্সর ও এ ধারণার প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণার সঙ্গে সোনেরার প্রযুক্তির যোগাযোগ হয়।

২০১৬ সালে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে প্রেসিডেন্সিয়াল আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স সম্মাননা দেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা স্মারক।

এই প্রযুক্তি কৌশলে বৈদ্যুতিক সংকেতের বদলে চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করে। বৈদ্যুতিক সংকেত মাথার খুলির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকাংশে দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণে চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্তের পদ্ধতি ভবিষ্যতে কার্যকর ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা চিন্তা-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি তৈরিতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে।

সহপ্রতিষ্ঠাতা (সোনেরা) নিশিতা ডেকা বলেছিলেন, প্রথমে ধাপে তাদের লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্কের ছবি ধারণের প্রযুক্তিকে সহজ বহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করা। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য মস্তিষ্কের সক্রিয় কয়েক ধরনের সংকেত সরাসরি শনাক্ত করা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিগ্রহণ তথ্য বলছে, সংস্থার ওয়েবসাইটটি এখন সক্রিয় নেই। অ্যাপল ২০২৬ সালের মধ্যভাগে সোনেরা স্বত্ব অধিগ্রহণ করে। অ্যাপল বা সোনেরা এখনও অধিগ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি।

অ্যাপল যে কারণে এগিয়ে

অ্যাপল কর্তৃপক্ষ সোনেরা অধিগ্রহণের তথ্যটি কাউকে আগেভাগে জানাতে চায়নি। কিন্তু ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য থেকে প্রকাশ পেয়েছে অ্যাপল ও সোনেরা চুক্তির অতি গোপন খবর। অ্যাপল ঘড়িতে এখন হার্ট-রেট রয়েছে। কিন্তু সোনেরা যা পারে, তা হলো যে কারও ব্রেইন, নার্ভ ও পেশির প্রকৃত ভাষা শনাক্ত করা। ভবিষ্যতে হয়তো কথা না বলে, শুধু চোয়ালের পেশির নড়চড়ার মাধ্যমে অ্যাপল ভিশন প্রোকে কমান্ড দেওয়া যাবে। অনেকের হাত নেই। তারা কৃত্রিম হাত নড়াচড়া করবে শুধু চিন্তার শক্তিকে।

ঠিক এ কারণেই অ্যাপল দুই কোটি ডলারের এই ছোট্ট হেলথকেয়ার স্টার্টআপকে হাতছাড়া করতে চায়নি। বিনিময় অর্থের কোনো তথ্য সামনে আনেনি অ্যাপল। কারণ, তাদের কাছে অর্থ বড় নয়; বড় হলো আগামীর ধারণা।

অনেক সময় শোনা যায়, ব্রেইন ড্রেন। কিন্তু সায়েফের মতো গবেষকরা প্রমাণ করেন, ব্রেইন কখনও ড্রেন হয় না। ব্রেইন ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বের কল্যাণে। বুয়েটের ক্লাসরুম থেকে আজ বার্কলের ল্যাব, সেখান থেকে অ্যাপলের বোর্ডরুম– এই দূরত্ব ১২ হাজার মাইল। কিন্তু বিশ্বাস, নিষ্ঠা আর সম্ভাবনার দূরত্ব বলতে কিছু নেই আদতে।

আরও পড়ুন

×