ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ভাবনা বদলেছে সোশ্যাল মিডিয়ার

ভাবনা বদলেছে সোশ্যাল মিডিয়ার
×
×

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৯

ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক আসার আগেই অনলাইন বন্ধুত্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে যে প্ল্যাটফর্মটি সামনে আসে, তার নাম অর্কুট। অনেককে এটিই দিয়েছিল প্রথম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করার সুযোগ, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের আগের প্রজন্ম অর্কুটের হাত ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে প্রবেশ করে। আজকের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, শর্টস ও রিলসের যুগে যেখানে অ্যালগরিদমের দাপট আর সাজানো ছবি ও ভিডিওর ছড়াছড়ি, অর্কুটের সেই সময়ে বিষয়টি ছিল বেশ সরল ও সাদামাটা। এ সময়ের মতো জনসমাগমে হইচই না করে ভার্চুয়াল জগতে যেভাবে নীরবে বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায়, তা-ই দেখিয়েছিল এ প্ল্যাটফর্ম। যে সময় অর্কুটের আগমন হয়েছিল, তখন আজকের মতো ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের জোগান বা স্মার্টফোনের রমরমা ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়া তখনও সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেনি। 

ধীরগতির ইন্টারনেট থাকা টাচস্ক্রিন ফোনও গুটিকয়েকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য ছুটে যেতে হতো সাইবার ক্যাফেতে। সেই ক্যাফেতে বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্র্যাপবুক লেখা, বন্ধুদের প্রোফাইলে গিয়ে ‘টেস্টিমোনিয়াল’ দেওয়া বা প্রিয় ব্যান্ডের কমিউনিটিতে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি ছিল খাঁটি আবেগের প্রকাশ। প্রযুক্তিগতভাবে তখনকার সোশ্যাল মিডিয়া অনেক পিছিয়ে থাকলেও যোগাযোগের আনন্দ ও আত্মিক টানটা ছিল তার চেয়ে বহু গুণ বেশি। সেই নস্টালজিয়া আবার ফিরতে চলেছে? সাম্প্রতিক এক খবরে সেই জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় আগে যে প্ল্যাটফর্মকে গুগল বন্ধ করে দিয়েছিল, সেটিকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার কথা চলছে। অর্কুটের প্রতিষ্ঠাতা অর্কুট বুয়ুককোকতেন নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য সবার কাছে সমর্থন চেয়ে প্রচার অভিযান শুরু করেছেন। তাঁর লক্ষ্য, এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে শুধু ভিউ, লাইক বা মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা নয়; গুরুত্ব পাবে বন্ধুত্ব, বাস্তব সম্পর্ক, আবেগ ও মানবিক আন্তঃযোগাযোগ। এই উদ্যোগে আগ্রহীর সমর্থন চাওয়া হয়েছে। তবে পুরোনো অর্কুট আগের রূপে ফিরছে এমন কোনো সুনিশ্চিত বার্তা দেওয়া হয়নি। নতুন সোশ্যাল মিডিয়া কবে নাগাদ সক্রিয় হবে, তা অস্পষ্ট।

ফিরিয়ে আনতে সমর্থন

অর্কুট বুয়ুকোকতেন কিছুদিন আগে এক্স বার্তার পোস্টে সবার কাছে সমর্থন চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ইন্টারনেটের কাজ হওয়া উচিত মানুষকে নিজের পছন্দের মানুষদের খুঁজে পেতে সহায়তা করা।  অর্কুটের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন তিনি। সেখানে নিজের উদ্যোগকে সমর্থন করার জন্য আগ্রহীর নাম নথিভুক্ত করতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই ওয়েবসাইটে 
১১৫টি দেশের দুই লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ সমর্থন জানিয়েছেন। তবে নাম নথিভুক্ত করলেই নতুন প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট বা নির্দিষ্ট ইউজারনেম পাওয়া যাবে– এটি নিশ্চিত নয়।

আপত্তির পেছনের কারণ

গত দুই দশকে সোশ্যাল মিডিয়ার চরিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অর্কুট বুয়ুকোকতেনের মতে, মানুষের মধ্যে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার বদলে এখন অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর যত বেশি সম্ভব সময় ধরে রাখতে মনোযোগী। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, দুই দশকের বেশি আগে আমি কয়েকটি সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলাম। সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে ভুল পথে এগিয়েছে, তা আপনাদের সঙ্গে দেখেছি। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এখন এমন ফিড তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেয়ে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এক প্রজন্মের শিশুদের এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে, যাতে তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। শেষমেশ বিজ্ঞাপনদাতার কাছে শুধু পণ্যে পরিণত হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্বিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্কুটের নির্মাতা বলেন, ডিপফেক, বট ও এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের দাপটে অনলাইনে কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তিনি সত্যিকারের মানুষ কিনা, তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ইন্টারনেটে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অসাধারণ প্রযুক্তি, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির মূল ভিত্তিটি ছিল অন্য প্রান্তে আরেকজন সত্যিকারের মানুষ খোঁজ। সেটিই সোশ্যাল নেটওয়ার্ককে অপরিহার্য করে সামনে আনে। এ প্রযুক্তি সে ধারণাকেই যেন দুর্বল করেছে।

যখন প্রথম আসা

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে গুগলের ইঞ্জিনিয়ার অর্কুট বুয়ুকোকতেনের তৈরি এ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সবার সামনে আনেন। ওই সময় ব্রাজিল ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশে এই প্ল্যাটফর্ম সাড়া ফেলে। পরে ফেসবুকের মতো অন্যসব প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা ও আধিপত্যের কারণে এটি জনসংযোগ হারিয়ে ফেলে। অবশেষে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অর্কুট বন্ধ ঘোষণা করে গুগল কর্তৃপক্ষ। অর্কুটকে ফিরিয়ে আনার ভাবনা অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২২ সালে নিজের ওয়েবসাইট নতুন করে সক্রিয় করে মানুষের মধ্যে অর্থপূর্ণ সুসম্পর্ক গড়তে নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরির কথা বলেছিল প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু সে যাত্রায় ফিরে আসা হয়নি। এবারও এ উদ্যোগ আপাতত সমর্থন সংগ্রহের পর্যায়েই রয়েছে। ফলে এর ফেরার সম্ভাবনা অনেকের মনে শিহরণ জাগালেও বাস্তবে  নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্কটি কেমন হবে– তা জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

×