ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

চার লাখ গাছ কাটার পর গুগল ডেটা সেন্টার তৈরি স্থগিত

চার লাখ গাছ কাটার পর গুগল ডেটা সেন্টার তৈরি স্থগিত
×
×

আবিদ রায়হান

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৫

সারাবিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অপরিহার্য করে তুলতে বাড়ছে ডেটা সেন্টার তৈরির উদ্যোগ। কিন্তু প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির ক্ষতিপূরণ যদি প্রকৃতিকে দিতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা যৌক্তিক– এমন প্রশ্ন সামনে আসছে। 

ফিনল্যান্ডে গুগলের ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা ঘিরে এমন প্রশ্নে হইচই পড়ে গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিবেশগত যাচাই-বাছাই না করেই উত্তর ফিনল্যান্ডের সুবিশাল বনাঞ্চলের আড়াই লক্ষাধিক গাছ এরই মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভ ঝেড়েছেন স্থানীয় ও পরিবেশকর্মীরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কর্তৃপক্ষ আপাতত বাধ্য হয়েই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে।

বন কেটে ডেটা সেন্টার

ফিনল্যান্ডের মুহোস শহরের কাছে ৩৩০ হেক্টর জমিতে গুগল ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এ প্রকল্পের জন্য আড়াই লক্ষাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। 

শুধু গাছই নয়; সরিয়ে ফেলা হয়েছে জমির ওপরের মাটির স্তরও। ফলে একসময়ের সবুজ বনায়ন এখন পরিণত হয়েছে কাদাপানি জমে থাকা গর্ত আর গাছের শিকড়ে ভরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এই এলাকা থেকে বয়ে যাওয়া বাদামি রঙের পানি কাছের জলাধারে মিশে যাচ্ছে, যা পরে ওলুজোকি নদীতে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে পানিদূষণের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্ধ হলো নির্মাণকাজ

ফিনল্যান্ডের লাইসেন্সিং অ্যান্ড সুপারভিশন অথরিটি প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন সম্পূর্ণ না করার কারণে মুহোস ও ওটানমাকি অঞ্চলে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওটানমাকি এলাকায় দেড় লক্ষাধিক গাছ কাটা হয়েছে বলে পরিবেশবিদদের ধারণা। অর্থাৎ, দুই এলাকা মিলিয়ে চার লক্ষাধিক গাছ কাটার অভিযোগ সামনে আসছে। গুগলের ফিনল্যান্ড শাখার প্রধান আন্তি জারভিনেন এই বন কাটার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সংস্থাটি বলছে, তৎকালীন আইনি পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজ করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ার পর নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গুগল।

বন্যপ্রাণীর বাসস্থান সংকট

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারাচ্ছে। ওটানমাকিতে নেকড়েদের লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা ঘটেছে। 
এ ছাড়া বনাঞ্চলে বাসা বাঁধা বিরল তিন আঙুলের কাঠঠোকরার মতো পাখিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে নির্মাণকাজের শব্দ, পানিদূষণ এবং ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ রক্ষা

ফিনল্যান্ডে গুগলের এই প্রকল্প বৃহত্তর এআই পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগের অংশ। দেশটির ঠান্ডা আবহাওয়া, জমির প্রাপ্যতা ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ডেটা সেন্টার তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী। সরকারও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছে।

সমালোচকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থার জন্য এত বড় পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? গুগল মুহোসে ১৩০ হেক্টর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা বলেছে। অন্যদিকে পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এত বড় বনায়ন ধ্বংসের ক্ষতিপূরণে এই উদ্যোগ সন্তোষজনক নয়। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের সুরক্ষাকে যথার্থ গুরুত্ব দিতে হবে। এআইর ভবিষ্যৎ তৈরিতে প্রকৃতির ক্ষতি কতটা মেনে নেওয়া যায়– এমন প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজছে ফিনল্যান্ড। 

আরও পড়ুন

×