নারীশিক্ষায় 'বসন্ত' এনেছেন বাসন্তী
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাড়াশের রত্নগর্ভা মা বাসন্তী মাহাতো - সমকাল
এম. আতিকুল ইসলাম বুলবুল, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২২ | ০০:৫০
'আমাদের মা আপন আলোয় উদ্ভাসিত। কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। পাশাপাশি বাবার গড়া বিদ্যালয়টিও চালাচ্ছেন। মা শুধু আমাদের নয়, অনেক নারীর স্বপ্ন-সারথি হয়ে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন।' কথাগুলো বলছিলেন তাড়াশ উপজেলার রত্নগর্ভা মা বাসন্তী মাহাতোর বড় মেয়ে স্কুলশিক্ষক নীলিমা মাহাতো।
বাসন্তী মাহাতো সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের দত্তবাড়ী গ্রামের প্রয়াত স্কুলশিক্ষক নিমাই চন্দ্র মাহাতোর স্ত্রী। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আদিবাসী অধ্যুষিত তাড়াশের 'দত্তবাড়ী' গ্রামটি এ উপজেলায় শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ আদর্শ একটি গ্রাম। যিনি আলোকবর্তিকা হয়ে এ গ্রামের মেয়েদের পথ দেখিয়েছেন, তিনি বাসন্তী মাহাতো।
সত্তর বছরের বাসন্তী মাহাতোর জন্ম রায়গঞ্জ উপজেলার বাঁশাইল গ্রামের একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত আদিবাসী পরিবারে। নানা সংস্কারের কারণে শিশুকালে স্কুলে গিয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ পাননি। ১৯৬৮ সালে ১৫-১৬ বছর বয়সে নিমাই চন্দ্র মাহাতোর সঙ্গে বিয়ের পর চলে আসেন দত্তবাড়ী গ্রামে। স্বাধীনতার পর নিমাই চন্দ্র শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া আদিবাসী অধ্যুষিত তাড়াশ-রায়গঞ্জ এলাকার নারীশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তাড়াশে নিজের জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন বিষমডাঙ্গা গার্লস হাই স্কুল। নিমগাছী ডিগ্রি কলেজ করতেও জমি দান করেন তিনি। এরই মধ্যে ২০০১ সালে এক ছেলে ও চার মেয়ে রেখেই মারা যান নিমাই চন্দ্র। শুরু হয় বাসন্তী মাহাতোর জীবনযুদ্ধ। সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। গৃহবধূ থেকে বাসন্তী মাহাতো হয়ে ওঠেন গ্রামবাসীর শিক্ষাক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক।
বাসন্তী মাহাতোর বড় ছেলে সঞ্জিব কুমার মাহাতো প্রদীপ রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছী ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনা করছেন। বড় মেয়ে নীলিমা মাহাতো নিমগাছীর একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক। দ্বিতীয় মেয়ে প্রভাতী মাহাতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা। তৃতীয় মেয়ে অনিমা মাহাতো সহকারী শিক্ষক হিসেবে রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত। ছোট মেয়ে প্রীতিলতা মাহাতো ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে এমএসএস করেছেন।
তার বাড়িতে গিয়ে কথা হলো বাসন্তী মাহাতোর সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি। তবে দমে যাইনি। শত বাধা পেরিয়ে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করেছি। এ যাত্রা সহজ ছিল না।
বাসন্তী জানান, অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেয়েদের পড়ালেখা করাতেও নানাজনের বিরূপ মন্তব্য শুনতে হতো। অনেকেই মেয়েদের লেখাপড়া না শিখিয়ে বিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু তাদের কথা শোনেননি তিনি।
কথা হয় বাসন্তীর ছেলেমেয়ের সঙ্গেও। সঞ্জিব কুমার মাহাতো প্রদীপ বলেন, কাজের চাপে মা তিন বেলা খাবারের সময়টাও পেতেন না। তারা কাজ করতে চাইলে বলতেন- 'তোমরা শুধু পড়ে ফার্স্ট হও।'
প্রভাতী মাহাতো বলেন, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে মা তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাধারণ গৃহবধূ হয়েও তার দৃঢ়তা তাকে মুগ্ধ করে।
তাড়াশের ইউএনও মেজবাউল করিম বলেন, বাসন্তী মাহাতো লড়াই-সংগ্রাম করে শুধু নিজের ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করেননি; বরং এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
- বিষয় :
- নারীশিক্ষা
- সিরাজগঞ্জ
- রত্নগর্ভা