ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

কষ্টের আখ এখন গলার কাঁটা

কষ্টের আখ এখন গলার কাঁটা
×
×

হেলে পড়া আখ বেঁধে রাখছেন কৃষক। ছবিটি চারঘাটের ঝিকরা এলাকা থেকে তোলা -সমকাল

 সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৪ | ২৩:১৬

চিনিকলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এক বছর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ক্রাশারে আখ মাড়াই। কিন্তু আখ পরিপক্ক হলেও এখন সংগ্রহ শুরু করেনি চিনিকল। এতে বিপদে পড়েছেন চারঘাটের 
চাষিরা। ক্ষেতে শুকিয়ে পড়ে থাকা আখের কারণে রবি মৌসুমে আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না তারা।   
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ক্রাশারে আখ মাড়াই ও গুড় তৈরিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন জেলা প্রশাসক। এদিকে আখ কাটার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ চিনিকল সংগ্রহ শুরু করেনি। কবে করবে তাও জানায়নি। এদিকে, ক্ষেত খালি না থাকায় কৃষি অধিদপ্তর থেকে বিনামূল্যে গম, মসুর, সরিষার বীজ ও সার দেওয়া হলেও সেগুলো ঘরেই পড়ে আছে।  
রাজশাহী চিনিকলের আওতায় ৯টি সাবজোন রয়েছে। সবচেয়ে বড় সাবজোন চারঘাট। চিনিকলের মোট আখের ৩০ শতাংশ এখান থেকে সরবরাহ হয়। এ বছর উপজেলায় ১ হাজার ৩৭০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭০০ টন। গত বছর চাষ হয়েছিল ১ হাজার ১৬০ একর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৬০০ টন। এ বছর ৭ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। গত বছর আখের দাম ২২০ টাকা মণ থাকলেও এবার ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ২৪০ টাকা।
সরেজমিন চারঘাটের মাঠ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অধিকাংশ আখ পরিপক্ব হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েছে। কোথাও  মাথাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এদিকে চাষিদের মাড়াইয়ে বাধা দেওয়া হলেও গভীর রাতে ভ্যান, নসিমন ও মিনি ট্রাকে আখ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দিন-রাত সমান তালে কারখানায় ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। 
ঝিকরা এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, দেড় বিঘা জমিতে আখ চাষ করেছি। সার, কীটনাশক মিলে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন বিক্রি করতে পারলে ৩৫-৪০ হাজার টাকা দাম পেতাম। চিনিকল কর্তৃপক্ষ আগে বড় চাষিদের আখ নেবে। পরে নেওয়া হবে ক্ষুদ্র চাষিদের। ততদিনে আখ শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে যাবে। 
রাওথা এলাকার শফিকুল ইসলাম বলেন, নিজের জমিতে ফসল আবাদ করছি। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারের ইচ্ছায়। মাড়াইয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরকার দেরি করে আখ সংগ্রহ করছে। ক্ষেতে আখ শুকিয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে শীতকালীন ফসল আবাদের জন্য জমি ফাঁকা করতে ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে আখ বিক্রি করছেন। সাধারণ কৃষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গঁওরা এলাকার গুড়ের কারখানা মালিক বলেন, যারা চিটাগুড় আমদানি করছেন, তারাই ভেজালগুড়ের কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা বাকিতে চিটাগুড় দেয়। আমরা আখ কিনে রস করে এর সঙ্গে চিটাগুড় ও আরও কিছু রাসায়নিক মিশিয়ে গুড় তৈরি করি। বিক্রির ব্যবস্থা করেন চিটাগুড় আমদানিকারকরা। লাভের বেশির ভাগই যাচ্ছে তাদের পকেটে।
ভারতীয় গুড় আমদানিকারক পরানপুর এলাকায় মজনু আলী বলেন, খাবারের জন্য গুড় আমদানি করি। এই গুড় থেকে ক্রেতারা নতুন গুড় তৈরি করেন। আমরা শুধু বিক্রি করি। কারখানায় গুড় নিয়ে কী করা হয় সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের না।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক মাসুম আলী বলেন, যে কোনো ভেজালের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে। চারঘাট-বাঘা এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি অপরাধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 
কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, নভেম্বর মাস শুরুতেই গমের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। যত দেরি হবে প্রতিদিন গড়ে এক কেজি হারে ফলন কমতে থাকবে। ২৯ নভেম্বর চিনিকল চালু হবে। সব জমি ফাঁকা হতে কতদিন সময় নেবে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। আখের জমি ফাঁকা না হওয়ায় শীতকালীন ফসলের আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমছে। যার প্রভাব পড়বে কৃষিতে। 
রাজশাহী চিনিকলের চারঘাট সাবজোন প্রধান রুস্তম আলী বলেন, পরিপক্ব না হলে আখ মাড়াই করে চিনি পাওয়া যায় না। এ জন্য একটা গড় সময় নির্ধারণ করে সংগ্রহের সময় ঠিক করা হয়েছে। চাষিদের কথা ভেবে সংগ্রহের সময় কিছুদিন এগিয়ে আনা হয়েছে। আগামী বছর আরও এগিয়ে আনা হবে। তবে  ক্রাশারে আখ মাড়াইয়ে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমাদের করণীয় কিছু নেই।

আরও পড়ুন

×