অনিশ্চয়তার শাহজীবাজার রাবার বাগান এখন আশার আলো
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে শাহজীবাজার রাবার বাগানে রাবার প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যস্ত শ্রমিকরা- সমকাল
নুর উদ্দিন সুমন, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৫
এক সময় লোকসানের বোঝায় নুয়ে পড়া শাহজীবাজার রাবার বাগান ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে সবুজে মোড়া এই রাবার বাগান এখন নতুন সম্ভাবনার নাম। এমনটাই দাবি করেছেন বাগান-সংশ্লিষ্টরা।
মাত্র কয়েক বছর আগেও প্রাণহীন অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছিল দেশের অন্যতম এই রাবার বাগান। উৎপাদনে ভাটা আর বাজারে কাটতি কমায় আয়ে ধস নামে। মজুরি নিয়ে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় শ্রমিকরাও কর্মবিমুখ হতে শুরু করেন। এমন অবস্থায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বাগানের ভবিষ্যৎ। সম্প্রতি রাবার বাগান ঘুরে নজরে এসেছে ভিন্নচিত্র। চারদিকে নতুন চারা আর কচি পাতার সবুজ সাজে নতুন করে শোভা ছড়াচ্ছে বাগানটি।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফআইডিসি) ব্যবস্থাপনায় ১৯৮০ সালে প্রায় ২ হাজার ১০৪ একর পাহাড়ি জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহজীবাজার রাবার বাগান। পর্যায়ক্রমে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার রাবার গাছ রোপণ করা হয় বাগানে। ১৯৯০ সাল থেকে উৎপাদন শুরু হলেও ২০১৫ সালের পর থেকে পুরোনো গাছের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। ফলে উৎপাদন কমে গিয়ে বাগান লোকসানে পড়ে যায়।
শাহজীবাজার রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক নন্দী গোপাল রায় জানান, বহু গাছ জীবনচক্র শেষ করায় উৎপাদন কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নানামুখী উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৬০ একর জমিতে নতুন গাছ লাগানো হয়েছে। তিনি আশাবাদী, কয়েক বছরের মধ্যে এসব চারা থেকে নতুন করে রাবার উৎপাদন শুরু হবে। চারাগুলো নষ্ট না হওয়ায় নতুন করে সম্ভাবনা জেগেছে।
এই কর্মকর্তা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৭০ টনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ৪২৯ দশমিক ৯৪ টন রাবার উৎপাদন সম্ভব হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯৫ টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৭৬ দশমিক ২২ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। এ ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করছে শাহজীবাজার রাবার বাগান আবারও সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে।
বর্তমানে বাগানে ২৫৭ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করছেন। তাদের কঠোর পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতায় বাগান আবারও প্রাণ ফিরছে। একটা সময় উৎপাদন হ্রাসে আয় কমে যাওয়ায় যে শ্রমিকরা চরম সংকটের মধ্যে লড়াই চালিয়ে গেছে তাদের হাত ধরেই মূলত মৃতপ্রায় বাগানটিতে সঞ্জীবনী শক্তি ফিরছে বলে জানান সেখানকার কর্মকর্তারা। ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাওয়া এমন সম্মানে আবেগাপ্লুত সেখানকার রাবার শ্রমিকরা।
বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও অনিশ্চয়তায় ভরা এই কর্মস্থল এখন আশার আলো দেখাচ্ছে। সময়মতো বেতন পাওয়া, কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সম্মিলিতভাবে কাজ করা এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এক্ষেত্রে জরুরি। ব্যবস্থাপকের সঠিক দিকনির্দেশনার পাশাপাশি কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রত্যাশিত সহায়তা পাওয়া গেলে লোকসান কাটিয়ে এই বাগান শুধু ঘুরেই দাঁড়াবে না, দেশের রাবারশিল্পে নতুন দিগন্ত সূচনা হবে।
ব্যবস্থাপক নন্দীগোপাল রায় জানান, লক্ষ্য শুধু লোকসান কাটানো নয়। তারা চান শাহজীবাজার রাবার বাগান দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখুক। রাবারশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি নির্ভরশীল উৎসে পরিণত হোক। এখানকার শ্রমিকরা যেভাবে লড়াই করেছে এই প্রত্যাবর্তন তারই একটি শক্তিশালী অবলম্বন হয়ে উঠুক। এদিকে সরকারও রাবারশিল্পকে এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রাবার উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন ক্লোন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছে আবেদন করা হয়েছে, একটি দেশ সাড়া দিয়েছে। একই সঙ্গে রাবারশিল্পের পাশাপাশি বৈচিত্র্যমুখী বনজশিল্পের প্রসার ঘটাতে মাস্টারপ্ল্যানও প্রণয়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন চারা রোপণ, উৎপাদন বাড়ানোর ইতিবাচক ধারা ও সরকারি উদ্যোগ শাহজীবাজার রাবার বাগানকে আবারও লাভজনক খাতে পরিণত করবে। এভাবে লোকসান কাটিয়ে ওঠা শুধু বাগানের নয়, দেশের রাবারশিল্পের জন্যও একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা বয়ে আনছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন চারা রোপণ, উৎপাদন বাড়ার ধারা ও সরকারি সহায়তা শাহজীবাজার রাবার বাগানকে আবারও লাভজনক খাতে পরিণত করবে। একই সঙ্গে দেশের রাবারশিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একসময় লোকসানে নুইয়ে পড়া এ বাগান এখন আশার আলো দেখাচ্ছে।
- বিষয় :
- আশার আলো