ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

পিরোজপুরের নাজিরপুর

অবৈধ বালু উত্তোলনে ভাঙনের মুখে কয়েকটি গ্রাম

বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার জড়িত থাকার অভিযোগ

অবৈধ বালু উত্তোলনে ভাঙনের মুখে কয়েকটি গ্রাম
×

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় নির্বিচারে বালু উত্তোলন করায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি তোলা- সমকাল

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পিরোজপুরের নাজিরপুরে নদীভাঙন ঠেকাতে বালুমহালের ইজারা বাতিল ও বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এক মাস আগে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে চিঠি দিয়েছিল। এ চিঠির বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দপ্তর কোনো পদক্ষেপই নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বালু উত্তোলন চলতে থাকায় নদীভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাজার। আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরের শত শত পরিবারের। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মহালের নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। তারা প্রতিবাদ করলে বালু উত্তোলনকারীরা হুমকি দেয়। বালু তোলার সঙ্গে জড়িত সবাই স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ও মালিখালী ইউনিয়ন-সংলগ্ন মধুমতী, বলেশ্বর ও তালতলা নদীর মোহনার ২৪ দশমিক ২১ একর বালুমহাল এক কোটি ৫৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তবে ইজারাদার নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে না পারায় তা বাতিল করে খাস ইজারা (দিন বা মাস ভিত্তিতে) দেওয়া হয়। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হাসান খান, শাঁখারীকাঠি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শ ম রেজাউল করিম ও যুবদল নেতা মিজান শরীফের নেতৃত্বে বালু তোলা হচ্ছে। নির্ধারিত বালুমহালের বাইরে গিয়ে মালিখালী ও শাঁখারীকাঠি ইউনিয়নের চাঁদকাঠি, কারখানাবাড়ী ও গীলাতলা এলাকায় কালীগঙ্গা, মধুমতী, বলেশ্বর ও তালতলা নদী এবং সাচিয়া, মালিখালী এলাকার নদী থেকে বালু তোলার কাজ চলছে।

মালিখালী ইউনিয়নের কারখানাবাড়ী ও শাঁখারীকাঠি ইউনিয়নের গীলাতলা এলাকার কালীগঙ্গা নদী থেকে এমবি আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও সাব্বির রহমান নামে দুটি ড্রেজার দিয়ে বালু কাটতে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ড্রেজার দুটির মালিক মাটিভাঙ্গার বাজারের লিয়াকত শেখের ছেলে হাসিব শেখ। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, কালীগঙ্গা নদী থেকে বালু তোলার ফলে ১৭ আগস্ট সাচিয়া বাজার, লড়া-সাচিয়া সংযোগ সড়কের বিভিন্ন স্থানসহ চাপাখালী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে হুমকির মুখে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ মসজিদ-মন্দির। 

সাচিয়া বাজারের ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সমীর বিশ্বাস জানান, ১৭ আগস্ট সকালে হঠাৎ তাঁর দুটিসহ সাতটি দোকানঘর এবং সদ্য নির্মিত বাজারের খেয়াঘাটসহ একটি মসজিদ ও একটি মন্দির নদীতে বিলীন হয়েছে। বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান শেখ বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে বাজারটি ভাঙনের কবলে পড়েছে।

কারখানবাড়ী এলাকার গৃহবধূ শোভা রানী বলেন, অনেক কষ্টে বসবাসের জন্য একটি বিল্ডিং করছি। বিল্ডিংয়ের কাছে নদী থেকে বালু উত্তোলন করায় আতঙ্কে আছি। কারখানাবাড়ী এলাকার পরিমল বেপারী বলেন, প্রতিদিন দুটি বা তার বেশি ড্রেজার দিয়ে দিনরাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্কুলশিক্ষক রণজিত রায় বলেন, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে একাধিকবার মানববন্ধন করেও কোনো লাভ হয়নি। 

বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে নাজিরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হাসান খান দাবি করেন, অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। ওই বালুমহাল নেছারাবাদের এক ব্যবসায়ী খাস ইজারা নিয়েছেন। যুবদল নেতা মিজানুর রহমান শরীফের ভাষ্য, তিনি বালু উত্তোলন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর একটি ড্রেজার সেখানে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তবে শাঁখারীকাঠি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিদের কাছে স্বীকার করেছেন, তিনি বালুর ব্যবসার একজন শেয়ার। নির্ধারিত মহালে বালু না থাকায় আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছেন। 

পাউবোর পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনে সৃষ্ট নদীভাঙন রোধে সেখানে দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। বালু মহালের ইজারা বাতিল ও নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন বন্ধের ব্যবস্থা নিতে গত ২০ জুলাই জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে তা কোনো কাজে আসেনি। 
নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, আমার কাছে কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এসব বিষয়ে জানতে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদকে ফোন দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব রুবায়েত ফেরদৌসের ভাষ্য, নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু কাটার অভিযোগ পেয়ে তারা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এখন নির্ধারিত মহালেই বালু কাটা হচ্ছে। পাউবোর আবেদন প্রসঙ্গে বলেন, তারা ইজারা বাতিলের চিঠি দিয়েছিল। পরে সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। কোন স্থানে বালু আছে, কোন স্থানে নেই– সেটা নির্ধারণ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান রুবায়েত।

পিরোজপুর-১ (নাজিরপুর, পিরোজপুর সদর ও জিয়ানগর) আসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সংরক্ষিত এমপি সুলতানা জেসমিন জুঁই বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×