ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর

সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট পৌনে চার লাখ টন প্রাকৃতিক সার

সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট পৌনে চার লাখ টন প্রাকৃতিক সার
×

শাহজাহান সোহেল, সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা)

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৫

গোয়ালঘর, খামার কিংবা বাড়ির উঠানে প্রতিদিন জমছে গোবর। অথচ সেই গোবর সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত না করায় কৃষকের জমিতে পৌঁছাচ্ছে না জৈব সার হিসেবে। ফলে বিপুল পরিমাণ গোবর উৎপাদন হলেও সাদুল্লাপুরে জৈব সারের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আর সেই ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর অতিরিক্ত ব্যবহার করতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার ২০০ টন রাসায়নিক সার। এর মধ্যে ইউরিয়া ৭০০ টন।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, অতিরিক্ত এই এক হাজার ২০০ টন রাসায়নিক সারের বর্তমান মূল্য প্রায় দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অথচ সাদুল্লাপুরে বছরে গোবর উৎপাদন হয় প্রায় চার লাখ ৪৭ হাজার ৫৪০ টন। এর বিপরীতে ফসল উৎপাদনে প্রক্রিয়াজাত জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে মাত্র ৭০ হাজার টন। অর্থাৎ গোবরের অভাব নেই; অভাব সেটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও জৈব সারে পরিণত করার পদ্ধতির। কৃষক ও খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো গেলে একদিকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো, অন্যদিকে জমির উর্বরতা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুর রব সরকার বলেন, ফসলের জন্য গোবর অত্যন্ত কার্যকর জৈব সার। এর প্রয়োগে জমির উর্বরতা বাড়ে এবং ফসলের রোগবালাই কমাতে সহায়তা করে। জমির মাটির গঠন ও গুণাগুণ উন্নত করে এবং পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়। দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির যে ক্ষতি হয়, জৈব সার তা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

কৃষি বিভাগ জানায়, সাদুল্লাপুর উপজেলায় বছরজুড়ে ১৭ হাজার ৯৩৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ হয়। এসব ফসল উৎপাদনে জৈব সার হিসেবে বছরে প্রয়োজন প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টন প্রক্রিয়াজাত গোবর। কিন্তু পাওয়া যায় মাত্র ৭০ হাজার টন। ফলে প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার টন জৈব সারের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে, উপজেলায় বর্তমানে গরু রয়েছে এক লাখ ৯৯ হাজার ২৩৬টি, ছাগল ৯৭ হাজার ৩২৬টি এবং ভেড়া পাঁচ হাজার ৭১৯টি। এসব প্রাণী থেকে বছরে প্রায় চার লাখ ৩৮ হাজার টন গরুর গোবর, আট হাজার ৯০০ টন ছাগলের মল এবং ৬৪০ টন ভেড়ার মল পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে বছরে গোবর উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় চার লাখ ৪৭ হাজার ৫৪০ টন।
এত বিপুল পরিমাণ গোবর উৎপাদনের পরও জৈব সারের ঘাটতি কেন– এ প্রশ্নের উত্তর মিলছে খামারিদের কথাতে। অনেক কৃষক কাঁচা গোবর সরাসরি জমিতে প্রয়োগ করেন। কেউ গোবর শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। আবার কোথাও পুকুরে মাছের খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে বড় একটি অংশ ফসল উৎপাদনে প্রক্রিয়াজাত জৈব সার হিসেবে ব্যবহারের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

কথা হলে ইসলামপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম, ছাইগাড়ী গ্রামের জোবেদ আলী ও জয়েনপুর গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তারা নিজেদের জমিতে প্রচুর গোবর ব্যবহার করেন। কিন্তু সেটি সঠিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা, তা তারা জানেন না। তাদের এলাকায় কৃষি বা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে গোবর সংরক্ষণ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

ভগবানপুর গ্রামের গরুর খামারি আব্দুল বারী সরকার খামার পরিচালনা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। কিন্তু গোবর সংরক্ষণ নিয়ে প্রশিক্ষণ পাননি। সরকারি উদ্যোগে এমন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলে গোবরের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানা যাবে। এতে গোবর থেকে বাড়তি আয় করার পাশাপাশি কৃষিতেও এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তানভিক জাহান বলেন, গোবর সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও নেই। পাশাপাশি গোবর মজুত রেখে বিক্রির জন্য নির্ধারিত বাজার নেই। ফলে গোবরের বড় অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। কেউ কেউ পুকুরে মাছের খাদ্য হিসেবে দেন, আবার অনেকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে রাখেন বা নষ্ট করেন।

এদিকে গোবরের ঘাটতির কারণে সাদুল্লাপুরে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৭০০ টন ইউরিয়া, ৩০০ টন এমওপি এবং ২০০ টন টিএসপি সার প্রয়োজন হয়। বর্তমান হিসাবে ৭০০ টন ইউরিয়ার মূল্য এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ৩০০ টন এমওপির মূল্য ৫৪ লাখ টাকা এবং ২০০ টন টিএসপির মূল্য ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত এক হাজার ২০০ টন রাসায়নিক সারের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ তথ্য জানিয়েছে কৃষি অফিস।

উপজেলা কৃষক সমিতির সভাপতি কামরুল ইসলাম বলেন, কৃষির জন্য সার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সঠিকভাবে গোবর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এ জন্য কৃষক ও খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু সাদুল্লাপুরে যদি এক হাজার ২০০ টন রাসায়নিক সার সাশ্রয় করা যায়, তাহলে দেশের সব উপজেলায় সঠিকভাবে গোবর ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, গোবর সংরক্ষণ নিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে কৃষক গ্রুপ নিয়ে আলোচনার সময় বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। সঠিক প্রক্রিয়ায় গোবরকে জৈব সার হিসেবে কাজে লাগানো কৃষক ও খামারির সংখ্যা এখনও কম। তিনি বলেন, সঠিকভাবে প্রস্তুত করা গোবরের উপকারিতা ব্যাপক। কিন্তু এসব না জানার কারণে অনেক পরিবার জ্বালানির ঘাটতি মেটাতে গোবর শুকিয়ে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে জৈব সারের সংকট তৈরি হচ্ছে এবং ক্ষতি হচ্ছে কৃষির।

 উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, গরু, ছাগল ও ভেড়ার মল স্থানীয়ভাবে গোবর সার হিসেবে পরিচিত। কাঁচা গোবর মজবুত ছাউনির নিচে ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হয়, যেন পানি ও তীব্র রোদ না লাগে। এতে সামান্য ইউরিয়া ছিটিয়ে দিলে দ্রুত পচনে সুবিধা হয়। এভাবে কয়েক দিন রেখে দিলে তা জৈব সারে পরিণত হয়। বায়োগ্যাস প্লান্টে ব্যবহারের পর পাওয়া গোবরও উন্নতমানের জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আরও পড়ুন

×