সমবায়ের প্রশিক্ষণে ‘ভুয়া’ প্রশিক্ষণার্থী
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৩৩
তৃণমূল পর্যায়ের সমবায়ীদের দক্ষতা বাড়িয়ে সফল সমবায় সমিতি ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে রাজশাহীর চারঘাটে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণের হাজিরা ও সম্মানী ভাতার মাস্টাররোল যাচাই করে বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীর নাম-পরিচয় ও সমিতির তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে মিল পাওয়া যায়নি। কারও নামে ব্যবহার অন্য সমিতির সদস্যের নাম করা হয়েছে; আবার এমন সমিতির নামে প্রশিক্ষণ দেখানো হয়েছে, যে সমিতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার চারঘাট উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের উদ্যোগে প্রশিক্ষণে আয়োজন করা হয়। উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের তথ্য এবং প্রশিক্ষণের হাজিরা ও সম্মানী ভাতার মাস্টাররোল অনুযায়ী, ২৫টি সমবায় সমিতির ৫০ জন সদস্য এতে অংশ নেন। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে সম্মানী, সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং খাতা-কলম দেওয়া হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। প্রশিক্ষক ছিলেন জেলা সমবায় কার্যালয়ের প্রশিক্ষক নাসির উদ্দীন। এতে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সমবায় অফিসের একটি সূত্রের ভাষ্য, তালিকায় ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীর নাম থাকলেও অন্তত ২০ জন ছিলেন ভুয়া। সমকালের অনুসন্ধানেও এ তালিকায় একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। একটি তালিকার ১৯ নম্বরে ‘আশার আলো গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজিবার রহমানের নাম, সই এবং সম্মানী ও খাবার গ্রহণের তথ্য রয়েছে। তালিকায় দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আজিবার রহমান জানান, তিনি চক মোক্তারপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আশার আলো সমিতি নামে তাঁর কোনো সমিতি নেই। ওই সমিতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হলেও তিনি ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি।
পরে আশার আলো গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতিতে যোগাযোগ করে জানা যায়, সমিতির সাধারণ সম্পাদক মারা গেছেন। বর্তমানে পদটি শূন্য। সমিতির কোনো সদস্য এই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। তালিকার ৭ নম্বরে ‘ভোরের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক জিন্নাত আলীর নাম ও সম্মানী গ্রহণের সই রয়েছে। তবে তালিকায় দেওয়া মোবাইল নম্বরে কল দিলে ধরেন নম্বরটির মালিক কালাম আলী। তিনি সাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্য।
কালাম আলীর ভাষ্য, তিনি ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর সেখানে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাও জানেন না। ভোরের আলো সমিতির সংশ্লিষ্টরাও জানিয়েছেন, তাদের কেউ প্রশিক্ষণে অংশ নেননি।
তালিকার ১৩ নম্বরে ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. মাইনুল হকের নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে। অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো সমবায় সমিতির অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। মাইনুল হক বলেন, ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি নামে কোনো সমিতির নাম আমি কখনও শুনিনি। সাধারণ সম্পাদক হবো কীভাবে!’ তবে জানান, প্রশিক্ষণে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তাঁকে যেখানে সই করতে বলা হয়, সেখানে সই করেন।
এ ছাড়া তালিকায় থাকা অন্তত ছয়টি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। চারঘাট উপজেলায় সমবায় সমিতির সংখ্যা ৯২টি। এর মধ্যে কিছু সমিতির কার্যক্রম বন্ধ। কয়েকটি সমবায় সমিতির সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পছন্দের কিছু সমিতিকে নিয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সমিতির নামে অন্য ব্যক্তিদের দেখিয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। এর প্রতিবাদ করলে সমিতির নিবন্ধন বাতিলের ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ তাদের। ফলে এসব অনিয়মের বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
তাদের অভিযোগ, কিছু সমিতি সমবায়ের নামে সুদের ব্যবসা ও মৎস্য সমিতির নামে সরকারি পুকুর কেনাবেচায় যুক্ত থাকলেও তাদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণে একই ধরনের অনিয়ম করা হয় বলেও জানান তারা।
অনুসন্ধানের প্রয়োজনে ২৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ১০ মিনিটে চারঘাট উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে সাড়ে ৯টা, ১০টা ও ১১টার দিকে গিয়েও অফিস খোলা পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে দুপুরে অফিস সহায়ক কৌশিক কুমার দাস এসে অফিসে আসতে বলেন। এ কার্যালয়ে বর্তমানে সমবায় কর্মকর্তা পদে কেউ কর্মরত নেই। অফিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন সহকারী পরিদর্শক আজিজ আহমেদ। মঙ্গলবার ও বুধবার দুদিন অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তালিকা আমিই করেছি। দু-একজনের নাম এলোমেলো থাকতে পারে, কিংবা টাইপ করার সময় এলোমেলো হতে পারে।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার জন্য তিনি পরদিন দেখা করতে বলেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘সমবায়ীদের দক্ষতা বাড়িয়ে দক্ষ সমবায়ী ও সফল সমবায় সমিতি গড়ে তোলার জন্য যে প্রশিক্ষণ, সেখানে যদি নামে-বেনামে তালিকা করে অনিয়ম করা হয়, তাহলে দক্ষ সমবায়ী গড়ে উঠবে কীভাবে? এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এই প্রশিক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দেন জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণে ২৫টি সমিতির ৫০ জন সদস্য অংশগ্রহণ করার কথা। অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- রাজশাহী
- প্রশিক্ষণ কর্মশালা