রাখাইনে সংঘাতের তীব্রতা, দুশ্চিন্তার ঢেউ টেকনাফে
জেলে আবদুল মতলব ৩০ এপ্রিল থেকে বন্দি আরাকান আর্মির হাতে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না বাবা নুরুল ইসলামের। গত সোমবার টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়ায় সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪৪ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাস ছয়েক আগে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গেলে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় দুটি নৌকাকে ধাওয়া করে আরাকান আর্মি। পরে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার এসব নৌকায় থাকা ৯ মাঝিমাল্লাকে ধরে নিয়ে যায় তারা। দীর্ঘ সময়েও খোঁজ মেলেনি তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। এই সংবাদে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে আরাকান আর্মির হাতে বন্দি শতাধিক বাংলাদেশি জেলের স্বজনদের মধ্যে।
শাহপরীর দ্বীপ এলাকার নৌকাগুলো থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ৯ জনের মধ্যে চারজনই এক পরিবারের। তারা হলেন–শাহপরীর দ্বীপ ডেইলপাড়ার আহমদ আলী, তাঁর ছেলে নুরুল আবছার ও আবদুর রহিম এবং আহমদ আলীর ভাগনে মো. হাসান। আহমদ আলীর স্ত্রী মুন্নি আক্তার বুধবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর পরিবারের
চার সদস্য এখনও আরাকান আর্মির হেফাজতে। তাদের ফেরার অপেক্ষায় এক-একটি দিন যেন এক-একটি বছরের মতো। এখন আবার নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিমান হামলা হচ্ছে। সেই খবরে তাদের ঘুম আসে না।
এই নারীর ভাষ্য, ছেলেদের চিন্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেও তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মি মোট ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করে। তাদের মধ্যে ২২২ জন বাংলাদেশি। অন্য ২১২ জন মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত (রোহিঙ্গা) নাগরিক। পর্যায়ক্রমে ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। তাদের ১৫৭ জন বাংলাদেশি ও ১৯১ জন রোহিঙ্গা। এখনও বন্দি আছেন ৮৬ জন জেলে। তাদের মধ্যে ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা। জেলেদের ভাষ্য, এই সংখ্যা আরও বেশি। যারা প্রশাসনের হিসাবে নেই।
সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট আরাকান আর্মির হাতে বিভিন্ন সময়ে আটক ২৪ জেলে ও মাঝিমাল্লাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে বিজিবি। তাদের ১৮ জন বাংলাদেশি, ছয়জন রোহিঙ্গা। এছাড়া গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জেলে, ১ এপ্রিল ১৪ জন, ৯ মে ১৪ জেলেকে ফেরত আনে বিজিবি।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার রাখাইনের ম্রাউক-ইউ টাউনশিপের একটি হাসপাতালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা চালায়। এতে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর স্বজনসহ অন্তত ৩৩ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় ৭০ জন।
যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার মধ্যে বন্দি জেলেদের স্বজনের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা শাহপরীর দ্বীপের আবু তাহের বলেন, আরাকান আর্মির বন্দিশালায় থাকা অবস্থায় তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফেরার সময় সেখানে অনেক জেলেকে বন্দি দেখেছেন। এখন সেখানে যুদ্ধ ও হামলার খবর শুনে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কেননা যুদ্ধের মধ্য কোন দিকে কখন হামলা হয় তার হিসাব থাকে না। যেকোনো সময় প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাঝি আবদুর রহমান, আবদুল মতলব, সাব্বির আহসেদ ও গোরা মিয়া নৌকা নিয়ে সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপসংলগ্ন সাগরে মাছ ধরতে যান। এ সময় তাদের আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সোমবার সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ৭৫ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম ঘরের দরজার সামনে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে নীরবে বসে আছেন। মুখজুড়ে হতাশার ছাপ, চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। ৩০ এপ্রিল আরাকান আর্মির হাতে বন্দি চারজনের মধ্যে ছিলেন তাঁর ছেলে আব্দুল মতলব।
নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলেটাই আমাদের সংসারের একমাত্র ভরসা। সে এখন এমন একটি জায়গায় বন্দি, যেখানে প্রতিদিনই যুদ্ধ চলছে, বিমান হামলা হচ্ছে। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? কখন কী হয়, সেই দুশ্চিন্তায় দিন-রাত কাটছে। যুদ্ধের খবর শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে। রাতে ঘুম আসে না।’
শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুরের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু তাঁর এলাকার ১৫ জনের বেশি জেলে এখনও আরাকান আর্মির কাছে বন্দি। রাখাইনে চলমান সংঘাত তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্দি জেলেদের ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার আকুতি জানান।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারে এখনও সংঘাত বন্ধ হয়নি। ফলে সেখানে আটক থাকা জেলে পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় আছেন। তাদের কীভাবে দ্রুত সময়ে ফেরানো যায়, এ নিয়ে সীমান্তের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
টেকনাফ বিজিবি-২-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়ার ভাষ্য, নাফ নদ-সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া সাড়ে ৩শ জেলেকে আরাকান আর্মির কাছ থেকে ফেরত এনেছেন। বাকিদের আনার চেষ্টা চলছে। তারা জেলেদের সীমানা অতিক্রম না করতেও নির্দেশ দিয়েছেন।
- বিষয় :
- রাখাইন