ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অনিয়ম দুর্ঘটনা প্রাণহানি, ব্যবস্থা নেই পাঁচ দিনেও

অনিয়ম দুর্ঘটনা প্রাণহানি, ব্যবস্থা নেই পাঁচ দিনেও
×
×

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনিয়ম করে মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ, সেটির ছাদে বিদ্যুৎস্পর্শে পাঁচ শিশু শিক্ষার্থী দগ্ধ ও দুজনের মৃত্যুর পরও এ নিয়ে আইনি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পরও মামলা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণভাবে বানানো তিনতলা ভবনটির বিষয়েও নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। উপজেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করেছে। আর পুলিশ বলছে কেউ অভিযোগ করলে তারা ব্যবস্থা নিতে পারত।
মাদ্রাসা ভবনটির মাত্র আট ফুট উপর দিয়ে গেছে এক লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তার। বিদ্যুৎ বিভাগ ও এলাকাবাসী মাদ্রাসা-ভবনের মালিককে না করেছিলেন এই তারের নিচে তিনতলা ভবন নির্মাণ না করতে। কিন্তু তিনি শোনেননি। একজন আইনজীবী বলেছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী এ ধরনের ভবনের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার প্রশাসনের রয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়ার মাহেলা খাতুন বালিকা মাদ্রাসার ছাদে বিদ্যুৎস্পর্শে পাঁচ শিশু শিক্ষার্থী দগ্ধ হয়। ওইদিন বিকেলে তারা ভবনটির ছাদবাগানের আখগাছে পানি দিচ্ছিল। এ সময় উপর দিয়ে যাওয়া ১৩২ কেভির বিদ্যুতের লাইন থেকে তারা বিদ্যুতায়িত হয়। তাদের মধ্যে রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জিদনি (১৪) ও আতিয়া (১১) নামের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। লামিয়া (১৩) নামের আরেক শিক্ষার্থী ৫৫ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে আছিয়া (১২) ও সুমাইয়া (১৩)।‎

এলাকার বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম জানান, এ জায়গার উপর দিয়ে বিদ্যুতের তার যাওয়ায় জায়গাটি কেউ কিনতে চায়নি। অনেক দিন পড়ে ছিল। পরে আব্দুর রহমান কাসেমি হুজুর জায়গার মালিককে বুঝিয়ে দান হিসেবে নিয়ে নেন। সেখানে মাদ্রাসা করেন। তিনি মাদ্রাসার মালিক। বিল্ডিং করার সময় বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এলাকার লোকজনকে নিয়ে বাধা দেয়। কিন্তু পরে কিভাবে যেন তিনি ভবনটি করে ফেলেন।

কাশিপুরের সমাজসেবক রাশেদুল ইসলাম বলেন, পাশাপাশি দুটি ভবনের মালিক আব্দুর রহমান কাসেমি। তিনি নারায়ণগঞ্জের একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার বোন জামাই। সে প্রভাব খাটিয়ে এলাকাবাসীর বাধা উপেক্ষা করে ২০০৮ সালে এই ১০ শতাংশ জমির ওপর দুটি ভবন নির্মাণ করেন। তিনি বলেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি হত্যা। নিহতদের পরিবারকে তারা কোনোভাবে প্রভাব বিস্তার করে মামলা থেকে বিরত রেখেছে। কিন্তু দেশে তো আইন আছে। এ ঘটনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ অবিলম্বে ভেঙে ফেলা উচিত।
বড় ভবনটিতে মাহেলা খাতুন মহিলা মাদ্রাসায় ৫০ জন আবাসিক ছাত্রী রয়েছে। আবাসিক-অনাবাসিক মিলিয়ে মাদ্রাসায় মোট ছাত্রী ২৫০। শিক্ষক-শিক্ষিকা ২০ জন। দুর্ঘটনার পর মাদ্রাসায় ছুটি   ঘোষণা করা

হয়।
পিজিসিবির নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম তারেক জানান, ভবনটির ওপর দিয়ে ১৩২ কেভির লাইন গেছে, যা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) আওতাধীন। যখন এই ভবন তিনতলা করা হচ্ছিল তখন পিজিসিবির পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা বাধা উপেক্ষা করে জেনে শুনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ করেছে। ভবনের ছাদ থেকে বিদ্যুতের তারের দূরত্ব খুবই কম। 
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ৭০ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে পুরোটা বা আংশিক ভেঙে দিতে পারে। এই ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ তা এর মধ্যেই প্রমাণ হয়েছে। 
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজিব জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার ভবনগুলো দেখভাল করা তাদের দায়িত্ব। এর বাইরের ভবনের ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে।

জানা গেছে, আগে নারায়ণগঞ্জে রাজউকের একটি অফিস ছিল। সেটি এখন নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন। নারায়ণগঞ্জ সদরের ইউএনও এসএম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে আগে আমাদের দায়িত্ব থাকলেও বর্তমানে এটি রাজউকের দায়িত্বে। এ ব্যাপারে তারা বলতে পারবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাটি তদন্তের জন্য আমরা সদরের এসিল্যান্ডকে দায়িত্ব দিয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি করেছি। তাদের প্রতিদেনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেব।
মাদ্রাসা ও ভবনের মালিক আব্দুর রহমান কাসেমি ভবনের তিনতলা নির্মাণের সময় বাধা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন আমাকে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সে নির্দেশনা অনুযায়ী আমি তিনতলা করলেও তিনতলার উচ্চতা দুইতলা থেকে কয়েক ফুট বেশি। বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। , আমার ভবন নির্মাণের কোনো কারণে এ ঘটনা ঘটেনি।

কারও অভিযোগ নেই, বসে আছে পুলিশ
এত বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও দায়ীদের আইনের আওতায় আনার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বা পুলিশ কোনো মামলা করেনি।
নিহত মাদ্রাসাছাত্রী আতিয়ার বাবা অটোরিকশাচালক মনির হোসেন গত বুধবার মেয়েকে নাটোরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করেছেন। জিদনির বাবা জানান, মেয়েকে দাফন করা হয়েছে নোয়াখালির চৌমোহনীর আলোকপাড়ায়। মামলার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, মামলা করে কি হবে? মেয়ে তো আর ফেরত আসবে না। আমরা গরিব মানুষ। তারা জানান, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা ও লাশ গ্রামে নেওয়ার খরচ বহন করেছে। তারা ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চিকিৎসাধীন লামিয়ার বাবা গার্মেন্টকর্মী আব্দুল আলিম বলেন, দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। এখানে মামলা করতে চাই না।
ফতুল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের কারও কোনো অভিযোগ নেই। কেউ অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম। তিনি জানান, নিহতদের পোস্টমর্টেম হয়েছে। এ ব্যাপারে রাজধানীর শাহবাগ থানায় জিডি হয়েছে। যদি কেউ এ ব্যাপারে পরেও কোনো অভিযোগ করে তাহলে জিডির সূত্র ধরে মামলা হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল জানান, পুলিশ এই ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করতে পারে। এ জন্য কারও অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই। এরপর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে এবং প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে পুলিশ এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির জানান, ইউএনওর তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরে ভবনটি যে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে থাকুক না কেন, আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভবনের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে তদন্তে ভবন মালিকের গাফিলতি পাওয়া গেলে এই হতাহতের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থাও করব।

আরও পড়ুন

×