ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও দেখে তিন মাস পর খুঁজে পেলেন স্ত্রীকে

সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও দেখে তিন মাস পর খুঁজে পেলেন স্ত্রীকে
×
×

তিন মাস পর স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আলী হোসেন; জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ছবি: সমকাল

মানিকগঞ্জ ও সাটুরিয়া প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:২৮

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের দর্জি আলী হোসেনের স্ত্রী আলেয়া বেগম (৪৩) দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ। প্রায় তিন মাস আগে তিনি হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এরপর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে রেলস্টেশন, মাজার, হাসপাতাল, পথঘাট-কোথাও খোঁজা বাদ রাখেননি আলী হোসেন। এর মধ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পাশের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল এলাকায় রাস্তার পাশে এক অসহায় নারীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হক। তিনি ‘ভয়েস অব রবিউল ভাই’ পেজে সেই নারীর দুই মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর তা চোখে পড়ে স্বামী আলী হোসেনের।

ভিডিওটি দেখে হোসেন বুঝতে পারেন, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা নারী তারই প্রিয়তমা স্ত্রী আলেয়া। সঙ্গে সঙ্গে সিংগাইরে ছুটে যান তিনি। তিন মাস পর স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আলী হোসেন; জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। অন্যদিকে স্বামীকেও চিনতে পারেন আলেয়া। ওই মুহূর্তের আবেগঘন দৃশ্য আপ্লুত করে উপস্থিত লোকজনকেও।

পরিবার জানায়, আলী হোসেন ২০০১ সালে আলেয়া বেগমকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে আলেয়া বেগম প্রথম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় ঢাকার একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। তবে মানসিক অসুস্থতার কারণে তিন বছর আগেও একবার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি। সেবার ৯ দিন পর তাঁর সন্ধান মেলে। সর্বশেষ, তিন মাস আগে তিনি আবারও বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন।

আলেয়ার স্বামী আলী হোসেন বলেন, এবার প্রায় তিন মাস ধরে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ সব জায়গায় খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাইনি। বাধ্য হয়ে পোস্টারিং করে নিখোঁজের খবরও প্রচার করি। স্ত্রীকে না পেয়ে খুব দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল। সে নিজের নাম-ঠিকানাও ঠিকমতো বলতে পারছিল না। সিংগাইরের গোবিন্দল এলাকার মানুষ তাকে কয়েক দিন ধরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে। কখনও মানুষের কাছে খাবার চেয়ে খেতেন, রাত কাটাতেন রাস্তার পাশেই।

তিনি আরও বলেন, ফেসবুকে ভিডিওটি দেখার পর এক মুহূর্তও দেরি করিনি, পরদিনই সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি সত্যিই আমার স্ত্রী! আমাকে দেখেই সে চিনতে পারে। তিন মাসের সব কষ্ট এক নিমেষেই দূর হয়ে যায় আমার। স্ত্রীকে উদ্ধার করে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি–এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। আলেয়াকে সাটুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সে এখন মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থ এবং পরিবারের সদস্যদেরও চিনতে পারছে।

আলেয়া বেগমের ছেলে মাহফুজুর রহমান বলেন, মাকে হারিয়ে এই তিন মাসে আমাদের পরিবারের সুখ-শান্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সামাজিক মাধ্যমের একটি ভিডিও আজ মাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।

ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হক বলেন, রাস্তার পাশে অসহায় নারীটিকে দেখে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা মনে হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকে ভিডিওটি বানিয়ে ফেসবুকে প্রকাশ করি। শেষ পর্যন্ত ওই নারীর স্বামী এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ায় আমি নিজেও আবেগাপ্লুত। একটি ফেসবুক ভিডিওর সূত্রে তিন মাসের দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসান ঘটেছে, হারিয়ে যাওয়া আলেয়া বেগম আবার স্বজনের কাছে ফিরেছেন। পরিবারের কাছে এটিই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়, আর আমার ভিডিও করাটাও সার্থক হয়েছে।

আলেয়া ফেরার পর সম্প্রতি সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে আলী হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা আলেয়া বেগমকে ঘিরে রয়েছেন, খবর পেয়ে তাকে দেখতে আসছেন প্রতিবেশীরাও। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকায় তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর রাখছেন পরিবারের সদস্যরা।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা হয় আলেয়া বেগমের সঙ্গে। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বামী ও সন্তানদের কাছে পেয়ে আমি এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।

সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, আলেয়া বেগমের প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে মানসিক ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×