খুলনা
হাসপাতালের এক কিলোমিটারে ৪৭ ক্লিনিক
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ডাক্তার গলি। এই সড়কে রয়েছে ১০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সম্প্রতি তোলা ছবি: সমকাল
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:২৪ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:২৪
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আগেই খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের চারপাশে এক কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে ৪৭টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে ৩৭টির অনুমতিই নেই।
অভিযোগ রয়েছে, খুমেক হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগের সামনে অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা ভিড় করে থাকেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, ভুল ও মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে রোগীর সঙ্গে প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অবৈধ এসব ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না স্বাস্থ্য বিভাগকে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন নিবন্ধন না দেওয়া ইতিবাচক। তবে অবৈধভাবে যেগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো বন্ধ না করলে এই উদ্যোগ কাজে আসবে না। কারণ নিবন্ধন না নিয়েও যদি অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানো যায়, তাহলে বৈধতার জন্য আবেদন করবে কেন?
এক গলিতেই ১৩ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার
গত বৃহস্পতিবার খুমেক হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে দুই পাশের ও সামনের এক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে ৪৭টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়। হাসপাতালের পূর্ব পাশে এক কিলোমিটার এলাকার সীমানা শুরু হয়েছে খুলনা বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে। এর মধ্যে ২৫টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। হাসপাতালের ঠিক সামনে মসজিদ গলিতেই রয়েছে ১৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। হাসপাতালের পশ্চিম পাশের এক কিলোমিটারের শেষ প্রান্তে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস। এ পাশে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক রয়েছে ৯টি।
রোগী হিসেবে ক্লিনিকগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটিতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে কোনো চিকিৎসকের স্থায়ী চেম্বার নেই। রোগীর প্রয়োজনে চিকিৎসকদের ডেকে আনা হয়। ক্লিনিকের ভাষায় এটাকে ‘অন কল’ বলা হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪৫০ মিটারের মধ্যে ‘প্রাইম হাসপাতাল’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) নেতারা। পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৪০ চিকিৎসক এই হাসপাতালের অংশীদার হয়েছেন। নিবন্ধন না পেলেও হাসপাতালটির চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে স্বাভাবিকভাবেই।
প্রাইম ক্লিনিকের ভেতরে কথা হয় বটিয়াঘাটার ভান্ডারকোর্ট থেকে আসা রহিমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, খুমেক হাসপাতালের তৃতীয় তলায় চিকিৎসকের চেম্বারে বসেই টেস্ট করাতে এই ক্লিনিকের কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলেছে, হাসপাতালের মেশিন নষ্ট, এখান থেকে কম খরচে পরীক্ষা করা যাবে।
হাসপাতালের অংশীদার ডা. তাজরুল ইসলাম তাজ বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনায় ধোঁয়াশা রয়েছে। নতুন কোনো হাসপাতালের নিবন্ধন দেবে না, কিন্তু পুরোনো এবং অবৈধভাবে যেগুলো চলছে–এসবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে? পুরোনোগুলো চললে নতুন নিবন্ধন দিতে সমস্যা কোথায়? আগে থেকেই খুমেকের আশপাশে সরকারি কোনো চিকিৎসক চেম্বার করেন না।
তিনি বলেন, সরকারি কোনো চিকিৎসক প্রাইম হাসপাতালের মালিকানায় নেই। তাদের স্বজনরা বৈধভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেই পারেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।
দালালদের দৌরাত্ম্য
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ভবনের প্রতি কক্ষের সামনে কোনো না কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল রয়েছে। হাসপাতালের নিজস্ব ল্যাবে নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষার সুযোগ থাকার পরও দালালরা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে আশপাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। ওই হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মীদের সঙ্গেও অবৈধ ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে সরাসরি ‘কমিশন বাণিজ্যের’ চুক্তি থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বহির্বিভাগের তৃতীয় তলায় চিকিৎসকদের কক্ষে থেকে বের হলেই এক নারীকে রোগীদের একপাশে ডেকে নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। নাম জানতে চাইলে আয়রা নামের ওই নারী জানান, তিনি প্রাইম হাসপাতালের কর্মচারী। আর কিছু না বলেই তিনি ওই স্থান থেকে সরে যান।
৩১২ নম্বর কক্ষে সামনে রিপোর্ট দেখানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন হোসনেয়ারা নামের এক নারী। তাঁর হাতে ছিল উদয়ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার রিপোর্ট। ওই নারীর স্বামী মো. শামীম জানান, ডাক্তার দেখানোর পর এক লোক বলেন, হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা করলে আজ আর রিপোর্ট দেখাতে পারবেন না। তিনিই একজনকে সঙ্গে দিয়ে দেন। সামনের এক ডায়াগনস্টিক থেকে পরীক্ষা করতে এক হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে।
ছয় বছরের মেয়ে সাদিয়াকে নিয়ে ৩১৬ নম্বর কক্ষে চিকিৎসক দেখিয়েছেন দৌলতপুরের কুলি বাগান এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের চেম্বার থেকেই এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলা হয়েছে এনার সঙ্গে যান। দ্রুত টেস্ট করে রিপোর্ট দিয়ে দেবে। দুই হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে।’
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুমেকের ল্যাবে টেস্টগুলো করা হলে হোসনেয়ারার টেস্টে ২৮০ টাকা এবং সাদিয়ার ৪৫০ টাকা খরচ হতো।
জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, মাঝেমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক ও জরিমানা করা হয়। কিন্তু অল্প দিনেই তারা বের হয়ে এসে পুরোনো কাজে জড়ান। তিনি বলেন, বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠানোর অভিযোগ পেয়ে বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন চিকিৎসককে সতর্ক করা হয়েছে।
খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, নতুন নির্দেশনা পেয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। আর যারা নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। শিগগির অভিযান চালানো হবে।
- বিষয় :
- খুলনা