ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বেড়েছে বাল্যবিবাহ, শিক্ষার্থী সংকটে বালিকা মাদ্রাসা ও স্কুল

বেড়েছে বাল্যবিবাহ, শিক্ষার্থী সংকটে বালিকা মাদ্রাসা ও স্কুল
×
×

 মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রামের উলিপুরে অবাধে চলছে বাল্যবিবাহ। এনজিওগুলোর কার্যক্রম বন্ধ এবং প্রশাসনের সক্রিয় তৎপরতার অভাবে এক প্রকার প্রকাশ্যে ঘটছে এসব বিয়ে। ফলে উপজেলার বালিকা মাদ্রাসা ও স্কুলগুলোতে দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থী সংকট। ক্লাসে অনুপস্থিতির হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঝরে পড়ছে অনেক ছাত্রী।

গত দুই বছরে উলিপুরে অন্তত ৪৭৯টি বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। বিপরীতে প্রতিরোধ করা গেছে মাত্র ৪০টি বিয়ে। যদিও স্থানীয়দের দাবি, ভেস্তে দেওয়া বাল্যবিবাহের অধিকাংশও পরে গোপনে সম্পন্ন হয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সিংহভাগ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এর জন্য বাল্যবিবাহকে দায়ী করছে।
জানা যায়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ‘আরডিআরএস বাংলাদেশ’-এর ‘চাইল্ড নট ব্রাইড’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। এ ছাড়া ব্র্যাকের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালে। গত বছরে এনজিওটি ১০টি বিয়ে প্রতিরোধ করতে পেরেছিল। অন্যদিকে, উপজেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক বিভাগ জানায়, বিগত তিন বছরে তারা মাত্র একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পেরেছে। এ ছাড়া তাদের কাছে এই-সংক্রান্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই।

এদিকে ‘ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ’ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার রক্ষা ‘প্রাইজ প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে এক হাজার ২০০ হতদরিদ্র পরিবারের ছয় হাজার কিশোরী শিক্ষার্থীকে নিয়ে ৬০টি ‘কিশোরী ক্লাব’ গঠন করে। সংস্থাটি ২০২৫ সালে ২৬টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে। এসব কিশোরীরা অনেকে বর্তমানে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলার আটটি বালিকা মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকছে। শ্রেণিশিক্ষকরা হোম ভিজিটের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন যে, অনুপস্থিত ছাত্রীদের অধিকাংশ বাল্যবিবাহের শিকার। তবে স্কুলের চেয়ে মাদ্রাসাগুলোতে এই প্রবণতা বেশি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদ্রাসার ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি এবং স্কুলের নবম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি।
প্রতিষ্ঠান প্রধানের তথ্যানুযায়ী– নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ৬০, নন্দু নেফরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৩, গুনাইগাছ রহমানিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ২০, রাজবল্লভ বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ৪০ ও চর কলাকাটা গনি মিয়া দাখিল মাদ্রাসার ১৫০ জন বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে হজরত ফাতেমা (রা.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৫৫, বাকরের হাট বালিকা বিদ্যালয়ের ৫ ও হাতিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাতজন ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে।

হজরত ফাতেমা (রা.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মানছুরা আক্তার হিমু আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, ‘মা-বাবারা সচেতন না হলে আমরা রেহাই পাব না। আমিও কোনো রকমে এই ফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছি।’
উপজেলার আপুয়ার খাতাম আমেনা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোমা আক্তারের মা হতদরিদ্র রত্না বেগম নিজের অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেন, ‘মেয়ের বিয়ে প্রায় ঠিক করে ফেলেছিলাম। কিন্তু কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা তা ভেঙে দেয়। তখন খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু আজ মেয়ে এসএসসি পাস করায় মনটা খুশিতে ভরে গেছে। মেয়ে বলে­– ‘মা, আমি পড়াশোনা করে চাকরি করব, তোমার অভাব দূর করব। এখন ভুল বুঝতে পেরেছি।’

হজরত ফাতেমা (রা.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাফেজ রুহুল আমিন বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাচ্ছে না। দিনে দিনে ছাত্রী সংখ্যা কমছে। এনজিওর প্রকল্প শেষ হওয়া, ইউনিয়ন পরিষদের ভঙ্গুর অবস্থা ও আইনি তৎপরতা কম থাকায় এই প্রবণতা বেড়েছে।’
চর কলাকাটা গনি মিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মশিউর রহমান জানান, দুর্গম চরাঞ্চলের এই প্রতিষ্ঠানে প্রচুর ছাত্রী ভর্তি হলেও বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। আগে গোপনে হলেও এখন প্রকাশ্যে বাল্যবিবাহ হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
উপজেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিম আল মোস্তাকুর বলেন, আমি একাই চারটি উপজেলার দায়িত্বে আছি। অফিসে জনবল সংকটও রয়েছে। তাছাড়া এনজিওগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধমূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
উলিপুরের ইউএনও এ টি এম আরিফ বলেন, ‘অভিযোগ বা খবর পেলেই আমরা তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দিই।  নারীবিষয়ক কার্যালয়, তথ্যকেন্দ্র ও জাতীয় নারী সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে।’

আরও পড়ুন

×