ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

জাঁকজমক বিদ্যালয়টি এখন অস্তিত্ব সংকটে

জাঁকজমক বিদ্যালয়টি এখন অস্তিত্ব সংকটে
×
×

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের টিনশেডের কক্ষে বসে আছে কিছু শিক্ষার্থী। ছবিটি গত বুধবার তোলা সমকাল

মনোজ সাহা, গোপালগঞ্জ

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বেও নেই কেউ। অভিভাবকহীন প্রতিষ্ঠনটিতে আছে কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারী। প্রথম বছর ৬৭৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬০ জন। স্থান বদলের কারণে কমে গেছে সুযোগ-সুবিধা, কমে গেছে শিক্ষার্থী। সাত বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদেরও বেতন বন্ধ। এক সময়ের জাঁকজমক বিদ্যালয়টি এখন অস্তিত্ব সংকটে। এই চিত্র গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশে মনোরম পরিবেশে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তখন ১৬ শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম বছর এখানে ৬৭৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। খোলা হয়নি কলেজ শাখা। ২০১৯ সালের পর শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে বিদ্যালয়টি পাঠদানের অনুমোদন পায়। পরে বিদ্যালয়টি উপাচার্যের বাসভবনের পাশে স্থানান্তর করা হয়। তারপর থেকেই বিদ্যালয়টির সৌন্দর্য হারাতে থাকে। শ্রেণিকক্ষ সংকট, নিরাপদ খাবার পানির অভাব, স্যানিটেশন ও পরিবহন সমস্যায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমতে থাকে। বর্তমানে এই বিদ্যালয়ের প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৬০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

বিদ্যালয়টির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশে মনোরম পরিবেশে পাঠদান করা হতো। এখানে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছিল। আধা পাকা ভবনের ১৬টি কক্ষে চলত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ২০২০ সালের দিকে হঠাৎ করে বিদ্যালয়টি উপাচার্যের বাসভবনের পাশে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে জরাজীর্ণ আধা পাকা ভবনের ৯টি কক্ষে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান এক সঙ্গে একই কক্ষে চলে। ওয়াশরুমের পাশে ঝোপ-ঝার। সাপের ভয়ে ওয়াশ রুমে যেতে পারে না শিক্ষার্থীরা। এসব কারণে শিক্ষার্থী কমে গেছে। প্রধান শিক্ষকও চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া খানম জানায়, এখানে প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে সে। বিদ্যালয়ে নানা সমস্যা। ওয়াশ রুম ও নিরাপদ খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। 
পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী ফরিদুজ্জামান আহসাফ বলে, ওয়াশ রুমের সঙ্গে ঝোপ-ঝার।  সেখানে সাপ থাকে। ভয় লাগে। এ ছাড়া বৃষ্টি হলে ক্লাসরুমের চাল দিয়ে পানি পড়ে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়ান জানায়, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই। রোদে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে।
শিক্ষার্থী তাইবুল্লাহ রোহান ও আশিকুল্লাহর মা তাসলিমা বেগম বলেন, ‘এখানে শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করেন। তারা শিশুদের সুন্দরভাবে দেখাশোনা করেন। তাদের কারণেই দুই ছেলেকে এখান থেকে নিয়ে অন্য স্কুলে দেইনি। তারা এখানেই পড়ছে।’

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহিমের মা সায়লা জামানের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চমৎকার ও নিরাপদ পরিবেশ শিশুদের মানসিক এবং সামাজিক বিকাশে সাহায্য করে। এই কারণে এখানে সন্তানকে ভর্তি করেছেন। কিন্তু এখানে সুযোগ-সুবিধার তুলনায় সমস্যা অনেক বেশি। এক কক্ষে একই সঙ্গে দুটি ক্লাস নেওয়া হয়। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক পাখা নেই। অন্যান্য সমস্যাতো আছেই। 
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম নাহিদ বলেন, তিনি এই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এখন গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই বিভাগে পড়ছেন। শিক্ষকরা বিদ্যালয়টিকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এটি কষ্টের বিষয়।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ঈমান আলী জানান, তিনি গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে পড়াশোনা করছেন। তাদের সময় এই বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব ভালো ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বিদ্যালয়টি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাদিম আহমেদ বলেন, ২০১৯ সালে তৎকালীন উপাচার্য চলে যওয়ার পর থেকে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ। বিদ্যালয়টি লাইব্রেরির পাশ থেকে উপাচার্যের বাড়ির পাশে স্থানান্তর করার পর থেকেই সংকট বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। সমস্যা দূর করলে এখানে শিক্ষার মান ও  শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাবে। এটি জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
সহকারী শিক্ষক আলেয়া বেগমের ভাষ্য, দীর্ঘ ৭ বছর বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না তারা। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টাকা ও তাদের পকেটের টাকা দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি। এতে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষক খুলনা, কোটালীপাড়াসহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে নিয়মিত স্কুল করেন। তাদের কষ্ট আরও বেশি।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে বিদ্যালয়টির সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছেন সহকারী শিক্ষক আফরোজা খানম।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহেল হাসানের ভাষ্য, বিদ্যালয়টির কোনো অনুমোদন নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামেও নেই। এখানে বিদ্যালয় হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মচারীও রয়েছে। তাই কমিটি করে এটি অর্গানোগ্রামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করবেন তিনি। তারপর ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেবেন। বিদ্যালয়টির ব্যাপারে যা যা করণীয় সব করবেন বলে আশ্বাস দেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা প্রসার, মেধা মনন ও কল্যাণে আমি বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান করব।’
 

আরও পড়ুন

×