বগুড়া
এক রাস্তায় পাঁচ প্রকল্প, কাজ হয়নি
এক বছরে ভূমি নিবন্ধন কর আদায় ১১০ কোটি টাকা
বগুড়ার সোনাতলার জোড়গাছা ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার এ রাস্তাটি (বাঁয়ে) পাকা করতে পাঁচটি প্রকল্প শেষ হয়েছে, টাকাও তোলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে রাস্তাটি দেখা গেল আগের মতোই। ছবি: সমকাল
এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বগুড়ায় গত বছর জমি রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) কর আদায় হয় ১১০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে অন্তত ১৫ কোটি টাকা নয়ছয়ের তথ্য সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ অর্থ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার কয়েকটি উপজেলায় প্রকল্পের নথি ও সরেজমিন অনুসন্ধানে অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে এবং নামমাত্র কাজ করে অর্থ তুলে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় আদায় করা এই অর্থ ইউপি, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার উন্নয়নকাজে ব্যয়ের বিধান রয়েছে। তবে বগুড়ায় এসব অর্থের একটি অংশ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউএনওদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যানরা প্রকল্প নিয়েছেন এবং বরাদ্দের একটি অংশ কমিশন হিসেবে দিয়েছেন।
যে খাতের টাকা
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় দলিলের মূল্যের ওপর ১ শতাংশ কর ইউনিয়ন পরিষদের জন্য এবং ১ শতাংশ উপজেলা পরিষদের জন্য আদায় করা হয়। পৌরসভা এলাকায় জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে পৌরসভার জন্য ২ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের জমির ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের জন্য ১ শতাংশ কর নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি অফিস ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে এসব অর্থ জমা দেয়।
বিধি অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের ১ শতাংশ অর্থের ৫০ শতাংশ দিয়ে গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা। ইউপির ১ শতাংশ অর্থ থেকে সচিব ও হিসাবরক্ষকের বেতনের ২৫ শতাংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করার কথা গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ছোট সেতু ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, পরিবেশ উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কাজে।
এক বছরে জমা ১১০ কোটি টাকা
জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে চার খাতে ১১০ কোটি ১৭ লাখ আট হাজার ৮৬৬ টাকা আদায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৯টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ২২ কোটি ২৬ লাখ ১৭ হাজার ২২৪ টাকা এবং উপজেলা পরিষদের জন্য ৩৭ কোটি ১৭ লাখ
৭৪ হাজার আট টাকা জমা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান না থাকায় উপজেলা পরিষদের অর্থের হিসাব পরিচালনা করেন ইউএনওরা। ইউপির অর্থও ইউএনওদের হিসাব নম্বরে জমা হয়।
জেলা পরিষদের হিসাবে জমা হয়েছে ২২ কোটি ২৬ লাখ ১৭ হাজার ২২৪ টাকা। পৌরসভা এলাকার জমি রেজিস্ট্রেশন থেকে ২ শতাংশ হারে জমা হয়েছে ২৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪১০ টাকা।
বেতন-ভাতা দেওয়ার পরও ৫০ কোটি টাকা
তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের অংশ থেকে ৫০ শতাংশ হারে এক হাজার ১৬ জন গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে চার কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইউপির অংশ থেকে ১০২ জন সচিব ও ১০৬ জন হিসাবরক্ষকের ২৫ শতাংশ বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে চার কোটি ৫৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৮০ টাকা।
অর্থাৎ গ্রাম পুলিশ, ইউপি সচিব ও হিসাবরক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ব্যয়ের পর দুই খাতে অবশিষ্ট থাকে ৫০ কোটি ২৬ লাখ ৭১ হাজার ৪৫২ টাকা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এর মধ্যে অন্তত ১৫ কোটি টাকা ২০২৫ সালে কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ইউএনওরা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
ইউপি ও উপজেলা পরিষদের এই অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের তদারকির দায়িত্ব ইউএনওদের। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন ইউএনও প্রকল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কমিশন হিসেবে দাবি করেছেন। চেয়ারম্যানদের কেউ সেই অর্থ দিয়েছেন, কেউ রাজি না হওয়ায় প্রকল্প পাননি।
অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে সমঝোতার মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া চেয়ারম্যানরা অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে অথবা নামমাত্র কাজ করে পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন। পরে ইউএনও ও চেয়ারম্যানদের মধ্যে অর্থ ভাগ হয়েছে।
সোনাতলায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ
জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে সোনাতলায় অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের জন্য ইউএনওর সোনালী ব্যাংক সোনাতলা শাখার হিসাবে এক কোটি ৫৭ লাখ ১৯ হাজার ১৬৭ টাকা এবং উপজেলা পরিষদের হিসাবে এক কোটি ৮৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩১৭ টাকা জমা হয়। উপজেলা পরিষদের অংশ থেকে গ্রাম পুলিশের বেতন বাবদ দেওয়া হয় ২৬ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা। ইউপি সচিব ও হিসাবরক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়নি।
দুই খাতে অবশিষ্ট তিন কোটি ১৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮৪ টাকা ইউপিগুলোর জনসংখ্যার অনুপাতে বণ্টনের কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ইউএনও স্বীকৃতি প্রামাণিক ৫০ শতাংশ কমিশনের শর্তে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই চেয়ারম্যানকে বেশি বরাদ্দ দেন। তারা হলেন জোড়গাছা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী ও পাকুল্ল্যা ইউপি চেয়ারম্যান লতিফুল বারী টিম।
অভিযোগ অনুযায়ী, জোড়গাছা ইউনিয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় সোয়া কোটি টাকার বেশি এবং পাকুল্ল্যায় অর্ধকোটি টাকার বেশি। দুই চেয়ারম্যানের সঙ্গে ইউএনওর প্রায় দুই কোটি ২৮ লাখ টাকা ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ। এর মধ্যে ইউএনও স্বীকৃতি প্রামাণিক একাই এক কোটি ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সোনাতলায় ৬৭টি প্রকল্পের মধ্যে ৪৩টি ভুয়া এবং অন্যগুলোর বেশির ভাগের কাজ ২০ শতাংশের বেশি হয়নি বলেও অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই রাস্তায় পাঁচ প্রকল্প
জোড়গাছা ইউপিতে যাওয়ার পথে জব্বারের বাড়ির সামনে প্রায় ৩০০ মিটার রাস্তার জন্য গত বছর পাঁচটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি ইউপির ১ শতাংশের অর্থে, একটি উপজেলা পরিষদের ১ শতাংশের অর্থে এবং অন্য তিনটি টিআর, কাবিখা ও টাবিখা কর্মসূচির। এসব প্রকল্পে প্রায় ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হলেও সরেজমিন রাস্তাটিতে মাটি কাটা বা ইটের সলিংয়ের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
জোড়গাছা ইউপি ভবন সংস্কারে উপজেলা পরিষদের ১ শতাংশ করের টাকা এডিপিতে স্থানান্তর করে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভবনে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি বলে সরেজমিন দেখা গেছে।
সিচারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পোশাক দেওয়ার জন্য দুই লাখ টাকা এবং এনায়েত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ দেওয়ার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সিচারপাড়া বিদ্যালয়ে ৩৮ জন শিক্ষার্থীকে প্রায় ৪০০ টাকা দামের পোশাক এবং এনায়েত আলী বিদ্যালয়ে ৫০ জনকে প্রায় ২০০ টাকা দামের ব্যাগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে।
সিচারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রশিদ বলেন, বরাদ্দের পরিমাণ তাঁর জানা নেই। তবে ৩৮ শিক্ষার্থীকে যে পোশাক দেওয়া হয়েছে, প্রতিটির দাম প্রায় ৪০০ টাকা।
জোড়গাছা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মুকুল অভিযোগ করেন, বিটুলের বাড়ি থেকে গোবরচাপা পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তার জন্য ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে কয়েক কোদাল মাটি কাটা ছাড়া কোনো কাজ হয়নি। সরেজমিন সোনাকানিয়া ও গুচ্ছগ্রামের কয়েকটি প্রকল্পেও কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তবে চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী বলেন, ভালো কাজ করায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইউএনও কোনো টাকা নেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
চেয়ারম্যান লতিফুল বারী টিম বলেন, তিনি যে অর্থ পেয়েছেন, তা দিয়ে সঠিকভাবে কাজ করেছেন। কোনো অনিয়ম বা কাউকে কমিশন দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
সোনাতলার তৎকালীন ইউএনও স্বীকৃতি প্রামাণিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। সঠিকভাবে কাজ করার পরই টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।
সারিয়াকান্দিতে ৪০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ
সারিয়াকান্দিতে উপজেলা পরিষদের হিসাবে জমা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৭৬১ টাকা এবং ইউপির জন্য ইউএনওর হিসাবে জমা হয়েছে এক কোটি ছয় লাখ ২৭ হাজার ৭৭৩ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ইউপি সচিব ও হিসাবরক্ষকদের দুই বছরের বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা হয়েছে।
কাজলা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ইউএনও বরাদ্দের বিপরীতে তাঁর কাছে ৪০ শতাংশ টাকা দাবি করেছিলেন। তিনি দিতে রাজি না হওয়ায় ১ শতাংশ করের কোনো প্রকল্প পাননি। অন্যরা কমিশন দিয়ে প্রকল্প নিয়েছেন।
ফুলবাড়ী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকার একটি রাস্তার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে কাজ হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। চেয়ারম্যান আনোয়ারুত তারিক মোহাম্মদ অবশ্য বলেন, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ দিয়ে কাজ করেছেন। ইউএনওকে কমিশন দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সারিয়াকান্দির তৎকালীন ইউএনও শাহরিয়ার রহমান বর্তমানে রংপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করেননি। বর্তমান ইউএনও এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, তিনি কয়েক দিন আগে যোগ দিয়েছেন; আগের সময়ের বিষয় তাঁর জানা নেই।
কাহালুতে ৭০ শতাংশ প্রকল্প ‘ভুয়া’
কাহালুতে উপজেলা পরিষদের হিসাবে জমা হয়েছে এক কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৭৫৬ টাকা এবং ইউপির জন্য এক কোটি ৮২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৮৫ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, কাহালু সদর ইউপির চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সহসভাপতি পিএম বেলাল হোসেন গত বছর কর্মরত ইউএনওকে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প নেন। এসব প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাগজে-কলমে ভুয়া ছিল বলে অভিযোগ।
আখুঞ্জা গ্রামের মিলনের বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তার জন্য দুই লাখ টাকা এবং সদর ইউনিয়নের প্রধান সড়কে বৃক্ষরোপণের জন্য আরও দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
তৎকালীন ইউএনও কাওসার হাবীব বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
শাজাহানপুরে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ
শাজাহানপুরে ইউপির জন্য জমা হয়েছে দুই কোটি ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৪৬ টাকা এবং উপজেলা পরিষদের হিসাবে পাঁচ কোটি ২৮ হাজার ৭৫ টাকা। উপজেলা পরিষদের অর্থ টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্পে ব্যয় করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নয়ছয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
১০৩টি প্রকল্পের মধ্যে কয়েকটি ভুয়া ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ২০ শতাংশ দিতে চেয়েছিলেন। পরে তাঁর কাছে ৪০ শতাংশ দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত ইউএনওর নির্ধারিত ব্যক্তির মাধ্যমে ৩০ শতাংশ দিতে হয়েছে।
ইউএনও তাইফুর রহমান প্রকল্পের তালিকা দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে তালিকা নেওয়া হয়েছে; তাঁর কাছে থাকা তালিকা দেওয়া যাবে না। এর বেশি তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
শেরপুরেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
শেরপুর উপজেলা পরিষদের হিসাবে তিন কোটি ৫৮ লাখ ৮৯ হাজার ৭৩৭ টাকা এবং ইউপির জন্য তিন কোটি ৫৪ লাখ ৮৫ হাজার ১৫০ টাকা জমা হয়েছে।
এখানেও ৩০ শতাংশ অর্থের বিনিময়ে চেয়ারম্যানদের প্রকল্প দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। মির্জাপুর, কুসুম্বী ও খানপুর ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি প্রকল্প পেয়েছে বলে জানা গেছে।
মির্জাপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প নিতে কিছু টাকা ব্যয় করতে হয়। অন্যদের মতো তিনিও ১ শতাংশ করের অর্থে প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন।
তৎকালীন ইউএনও সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ওই সময়ে তিনি সেখানে ছিলেন না। তাঁর সময়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।
তদারকি ও অডিট নেই
জমি রেজিস্ট্রেশন করের অর্থ ব্যয়ে ইউএনওদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি তদারকিও করেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধেই যখন অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগ উঠছে, তখন তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ইউপি ও উপজেলা পরিষদের আয়-ব্যয়ের নিয়মিত অডিট হওয়ার কথা থাকলেও বগুড়ায় প্রায় তিন বছর ধরে এ অডিট বন্ধ রয়েছে।
ইউপির হিসাব ও আর্থিক কার্যক্রম নিরীক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের। প্রতিষ্ঠানটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয়ের অধীনে। এ ছাড়া এডিপির প্রকল্পের হিসাব সিএ ফার্মের মাধ্যমেও নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। উপজেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ তদারকির জন্য কমিটিও রয়েছে, যার সভাপতি ইউএনও।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা বলেন, ১ শতাংশ করের অর্থ থেকে গ্রাম পুলিশ, ইউপি সচিব ও হিসাবরক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থে ইউএনও ও চেয়ারম্যানরা প্রকল্প নেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা তেমন নেই। তিন বছর ধরে অডিট বন্ধ রয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে তিনি ও জেলা প্রশাসক তদন্ত করতে পারেন।
জেলা পরিষদ ও পৌরসভার অর্থ
বগুড়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মো. শাহনেওয়াজ বলেন, জেলা পরিষদের হিসাবে জমা হওয়া অর্থ দরপত্রের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। ব্যক্তিকে সরাসরি কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
পৌরসভার অর্থ মূলত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয় বলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভাগুলো জানিয়েছে। কাহালু পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী আবুল বাসার বলেন, জমি রেজিস্ট্রেশন করের অর্থ দিয়ে কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার পর উন্নয়নকাজের জন্য আর অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য
জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, তিনি নিয়মিত বিভিন্ন উপজেলা পরিদর্শন করেন। পরবর্তী সফরে ১ শতাংশ করের অর্থের বিষয়টি দেখবেন। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তিনি নিজে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।