চারঘাটে আশ্রয়ণে আশ্রয়ের সংকট
মাদক সন্ত্রাস ও ঘর-বাণিজ্যে অসহায়
দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না হওয়ায় বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে আবাসনের ঘর। চারঘাটের হলিদাগাছী-২ আশ্রয়ণ প্রকল্প সমকাল
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গৃহহীনদের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করতে তৈরি হয়েছিল চারঘাট উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো। সংস্কারের অভাবে ঘরগুলো এখন দুর্ভোগের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। কোথাও চালের টিন ফুটো হয়ে বৃষ্টিতে ঘর ভেসে যাচ্ছে, কোথাও বা ভেঙে পড়েছে দরজা-জানালা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহিরাগতদের আনাগোনা, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এবং ঘর বেচাকেনার অবৈধ বাণিজ্য। বাধ্য হয়ে অনেকেই পরিবার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। অতিষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ শেষ সম্বলটুকু ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
উপজেলা নাগরিক কমিটি ও মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা জানান, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, দেখভালের অভাবে তা আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। গৃহহীন মানুষ সুবিধা পাওয়ার বদলে সুরক্ষাহীনতায় ভুগছেন।’
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে আশ্রয়ণের প্রায় ৮৫০টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে বড় প্রকল্প হলো ২০০৪ সালে নির্মিত ১৪০ ঘরের ‘হলিদাগাছী-১’ এবং ২০০৯ সালে নির্মিত ২৮০ ঘরের ‘হলিদাগাছী-২’ আবাসন। দীর্ঘ দিন সংস্কার না হওয়ায় আবাসন দুটি ঝোপ-জঙ্গলে ঢেকে গেছে।
হলিদাগাছী-১ আবাসনের বাসিন্দা মুকলেব আলী বলেন, চালের টিন ফুটো হয়ে অনবরত পানি পড়ে। গোঁজা দিয়েও পানি আটকানো যায় না। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করেই দিন কাটাতে হয়। হলিদাগাছী-১ আবাসনের সভাপতি আব্দুল মান্নান জানান, ১৪০টি ঘরের প্রায় সবকটিতেই পানি পড়ে। সংস্কারের আবেদনে কাজ না হওয়ায় ৩৫টি পরিবার আবাসন ছেড়ে চলে গেছে। হলিদাগাছী-২ আবাসনের সভাপতি জলি বেগম জানান, দুটি অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো আর মেরামত করা হয়নি। ১২০টি ঘর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং ৪৫টি পরিবার ঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
বাসিন্দারা আবাসন ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগে তৈরি হয়েছে অবৈধ ঘর বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। হলিদাগাছী-২ আবাসনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে ঘর বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। শিখা খাতুন নামে এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য স্বামীসহ কিছুদিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। সন্তান মারা যাওয়ার পর ফিরে এসে দেখেন, তাঁর নামে বরাদ্দকৃত ঘরটি অন্য এক ব্যক্তির কাছে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত স্বপন বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, ঘর খালি থাকায় নিয়ম মেনে অন্য এক পরিবারকে থাকতে দেওয়া হয়েছে।
আবাসনগুলোতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে মাদকের ব্যাপক চালানে। বাসিন্দাদের দাবি, নিয়মিত বহিরাগত মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের মেলামেশা চলছে। এতে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নারী ও শিক্ষার্থীরা। বেড়েছে চুরি ও ছিনতাই। হলিদাগাছী-২ এর ১৭ নম্বর ব্যারাকের ১০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মিঠু, তাঁর স্ত্রী আশা বেগম এবং ৮ নম্বর ব্যারাকের জিনারুলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, গত ছয় মাসে ইউএনও ও থানার ওসির কাছে পাঁচবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরিস্থিতি বদলায়নি। ফারজিনা বেগম বলেন, মেয়েরা বাইরে যেতে ভয় পায়। প্রতিবাদ করলে হেনস্তা করা হয়। ২০টি পরিবার ঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত মোহাম্মদ মিঠু অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন।
শুধু অবকাঠামোগত অসুবিধা কিংবা মাদক নয়; হুজারপাড়া ও নিমপাড়া আবাসনে চলাচলে সরকারি কোনো রাস্তা নেই। আবাসন থেকে প্রধান সড়কে যেতে হলে পার হতে হয় স্থানীয়দের ব্যক্তিগত জমি, যা নিয়ে প্রায়ই বিরোধ বাধে। হুজারপাড়া আবাসনের বাসিন্দা উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান, ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও রাস্তা না থাকায় ভ্যানটি বাড়িতে আনা বা চার্জ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঘর বরাদ্দের সময় এক মাসের মধ্যে রাস্তা করে দেওয়ার কথা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে সে কথা রাখেনি প্রশাসন।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফরহাদ লতিফ জানান, সরকার ঘর হস্তান্তরের পর তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উপকারভোগী নিজেদেরই। ঘর মেরামতের জন্য তাদের কাছে কোনো সরকারি বরাদ্দ আসে না।
চারঘাট মডেল থানার ওসি মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আবাসনগুলোতে কারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে পুলিশ কঠোর নজরদারি রাখছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক কারবারিদের কোনো পুলিশ সদস্য সহায়তা করছে– এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, তিনি নিজে আবাসন পরিদর্শন করে জরাজীর্ণ অবস্থা ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের কথা জেনেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।