ক্ষয়েই চলেছে পাহাড়ি টিলা
মাধবপুরের সুরমা ও চন্ডিছড়া চা বাগান সংলগ্ন চাকলাপুঞ্জি টিলার মাটিধস। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার সংরক্ষিত পাহাড়ি এলাকা এবং চা বাগানের উঁচু টিলা অবিরাম ক্ষয়ে চলেছে। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও প্রবল পানির স্রোতে এসব টিলা ভেঙে তার মাটি ঢলের পানির সঙ্গে এসে নদী ও ছড়ায় বিলীন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে মানবসৃষ্ট কারণে। নিয়মিত টিলা কাটা এবং পাহাড় ক্ষয় করে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের অনিয়ন্ত্রিত তৎপরতা এর প্রধান কারণ। এতে করে একদিকে চা বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়, সড়ক, সেতু ও জনবসতিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও টিলার ক্ষয় বা ভাঙন রোধের বিষয়টি বিশেষভাবে আমলে নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের। ভাঙন রোধে সরকারি-বেসরকারিভাবে কার্যকর ও টেকসই কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন এসব পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড় ও চা বাগানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় ছড়াগুলো দীর্ঘদিন ধরে বালু ও পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে। এতে পাহাড় ও চা বাগানের টিলা ধসে পড়ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক, সেতু ও বসতবাড়ি। সম্প্রতি সরেজমিন এসব ক্ষতির দৃশ্যমান পরিস্থিতি সামনে এসেছে। পাহাড়ি টিলা ক্ষয়ের ফলে এরমধ্যে সাতছড়ি টিপড়া আদিবাসী বসতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া এই এলাকার একাধিক সেতুসহ রামগঙ্গা সেতু, সুরমা চা বাগান এবং ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙনের কবলে পড়েছে।
কোথাও কোথাও বড় বড় টিলা ধসে ছড়ায় মিশে গেছে। এতে করে টিলার পাশাপাশি ছড়াও অস্তিত্ব হারাচ্ছে। সুরমা চা বাগানের টিংকু সাঁওতাল বলেন, এ বছর পাহাড়ি ঢলে ২০ নম্বর নির্মাণাধীন সেতুর সংযোগ সড়কের মাটি পানির স্রোতে ধসে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিবরিয়াবাদ সেকশনে বড় বড় টিলা ভেঙে ছড়ায় মিশে গেছে। সরকার বা বাগান কর্তৃপক্ষ– কেউই এগুলো রোধে এগিয়ে আসছে না। ছড়াগুলো খনন করে গাছ লাগানো হলে মাটি ধস অনেকটা রোধ করা সম্ভব।
সাতছড়ি টিপড়া আদিবাসী পল্লির হেডম্যান চিত্ররঞ্জন দেববর্মা জানান, ছড়া খনন না করায় টিপড়া বস্তির পাঁচটি বসতবাড়ি ছড়ায় বিলীন হয়ে গেছে। একটি ছোট ফুট ওভারব্রিজও পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়। ছড়ায় বালু জমে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা আগের তুলোনায় অনেকাংশে কমে গেছে। ফলে পাহাড় ও ছড়ার পাড় ভেঙে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিমত, পরিকল্পিতভাবে এসব টিলা রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে। টিলা কাটা বন্ধে শুধু কথিত অভিযানে কাজ হবে না। শক্ত হাতে দমন করতে হবে দুর্বৃত্তদের। তা না হলে প্রতি বছর পাহাড় ধসে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।
চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের অমর ভূমিজ বলেন, চাকলাপুঞ্জি ও রামগঙ্গার ভাঙন দেখলে ভয় লাগে। প্রতি বছর চা বাগানের বড় বড় টিলা ভেঙে যাচ্ছে। এবার ভাঙনে পুরাতন রামগঙ্গা মহাসড়কেরও ক্ষতি হয়েছে। কিছু অংশে পাকা করা হলেও অনেক জায়গা এখনও ভাঙা রয়ে গেছে।
সুরমা চা বাগানের ব্যবস্থাপক বাবুল সরকার বলেন, সুরমা চা বাগানের বিশাল এলাকায় টিলা ভেঙে যাচ্ছে। ছড়া খনন করে পানির স্রোত নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পাহাড় ও চা বাগানের ভাঙন রোধ করা সম্ভব। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক সদস্য ওমাইয়া ফেরদৌস বলেন, পাহাড় ও চা বাগানের টিলা ভেঙে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভাঙন রোধে সরকারকে টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে পাহাড়ি এলাকা ও চা বাগানের টিলাগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জিএম সরফরাজ বলেন, প্রতি বছর পাহাড় ও নদী ভাঙনের ঘটনা তারা প্রত্যক্ষ করছেন। এ বছরও অনেক পাহাড়ি টিলা, চা বাগান ও সেতু ধসে গেছে। কীভাবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা যায়, সে বিষয়ে কারিগরি দিকও দেখা হচ্ছে।
- বিষয় :
- টিলা ধস