সালদা-বাখরাবাদ
কসবায় সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে গ্যাস চুরি
ছবি: সংগৃহীত
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০২:৩৭
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় সালদা গ্যাসক্ষেত্র। এখান থেকে বাখরাবাদ কোম্পানির মাধ্যমে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই সঞ্চালন গ্রিডের পাইপ ছিদ্র করে একটি চক্র গ্যাস চুরি করে চুন ফ্যাক্টরিতে সরবরাহ করত। সম্প্রতি জানাজানি হওয়ায় কাজ বন্ধ করে পালিয়েছে চক্রের সদস্যরা।
সরেজমিন জানা গেছে, বায়েক ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া তার চুন কারখানায় গত এক মাস ধরে সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে চোরাই গ্যাস ব্যবহার করে আসছিলেন। কারখানার চারপাশে ৩০ ফুট উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন যাতে ভেতরে কেউ না দেখতে পারে। আশপাশের মানুষের বাড়ির চুলাগুলোতে গ্যাসের চাপ কম হওয়ায় তাদের সন্দেহ হয়। গত মঙ্গলবার রাতে বাখরাবাদ মেইন লাইনে দুটি ছিদ্র করে চোরাই চক্র। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করায় বিকট শব্দে গ্যাস বের হওয়ার আওয়াজে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। গ্যাসের গন্ধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন বুধবার সকালে স্থানীয় বিএনপি নেতা রুমি ভূঁইয়া সালদা গ্যাস ফিল্ড অফিসসহ দলীয় নেতাকর্মীদের বিষয়টি জানালেও কেউ গা করেনি।
রুমি ভূঁইয়ার অভিযোগ, বায়েক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া, গ্যাস ফিল্ডে কর্মরত রেজাউল করিম ও কামাল চুনের ফ্যাক্টরির সঙ্গে জড়িত।
তবে পরে গত শনিবার বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কোম্পানি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসলাইন থেকে চোরাইচক্রের ফুটো করা গ্যাস লাইনটি মেরামত করে।
নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, তিনি এই ফ্যাক্টরির জায়গা ঢাকার এক পার্টির কাছে ভাড়া দিয়েছেন। তার কাছে স্ট্যাম্প সংবলিত চুক্তিপত্র রয়েছে। গ্যাস চুরির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
বালিহুরা গ্রামের রোকেয়া বেগম বলেন, ঘনবসতি এলাকা। রাত ২টার দিকে বিকট আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙে। ওই রাতে বিদ্যুৎ ছিল না। হাজার হাজার মানুষ এখানে বসবাস করছে। হঠাৎ এখান থেকে আগুন ধরে গেলে কী যে অবস্থা হতো।
মঞ্জু মিয়া বলেন, ‘চক্রটি রাতের আঁধারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইন থেকে অবৈধভাবে ছিদ্র করে গ্যাস চুরি করার চেষ্টা করেছে। কুল্লা পাথরে চুনের ফ্যাক্টরিতে গ্যাসের চাপ কম হওয়ায় তারা বালিহুরা গ্রামে মেইন গ্রিডে দুটি ছিদ্র করেছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আমরা গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড কোম্পানির জিএম (অপারেশন) জাহিদুর রেজা বলেন, ‘এটা তো হাইপ্রেসার লাইন। হাইপ্রেসার লাইন বলতে এক পাশে সালদা গ্যাস ফিল্ড আর এক পাশে বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড। এই দুই ফিল্ডের মাঝে ১০ ইঞ্চি পাইপলাইন। এটা আমরা অপারেট করছিলাম ৬০০ পিএসআই দিয়ে। কে বা কারা এখানে ফুটো করে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছে। দুটি অফটেক বের করেছে, তার মধ্যে একটিতে তারা কানেকশন দিতে পেরেছে (অর্থাৎ পাইপটা ছিদ্র করছে) আর একটিতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে বৃহস্পতিবার আমরা মাটি খুঁড়ে জানতে পারি যে, এখান থেকে কেউ গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেদিনই আমাদের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্টকে ফোন করি। তারা এসে ড্রোন দিয়ে খুঁজে কোল্লাপাথরে একটি চুন ফ্যাক্টরি পেয়েছে। ওই ফ্যাক্টরিটা লো প্রেসার লাইন অর্থাৎ বাসাবাড়িতে যে লাইন আছে সে লাইন থেকে নিয়ে চুন ফ্যাক্টরি করেছে। সেটি অবশ্য আমরা প্রায় বন্ধ অবস্থায় পেয়েছি। বন্ধ মানে হয়তোবা ওই প্রেসার দিয়ে তারা চালাতে পারেনি। আমি যেটা সাসপেক্ট করছি, তারা লো প্রেসারে যেহেতু গ্যাস পাচ্ছিল না, এখান থেকে গ্যাস নিয়ে আশপাশে কোথাও শিফট করার মতো জায়গায় তারা চিন্তাভাবনা করছিল। আমরা এখন গ্যাস ফিল্ডের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইনের গ্যাস বন্ধ রেখে, ওইদিকে ওদেরও ইনফর্ম করে অর্থাৎ বাপেক্স এবং বিজিসিএলের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে এই লাইনের গ্যাস বন্ধ করে মাঝখানের গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দিয়ে আমরা এটাকে কিল করেছি।’
সালদা গ্যাস ফিল্ডের ইনচার্জ মো. নুরুজ্জামান ও ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কামাল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টা সম্পূর্ণ বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের। খবর পেয়ে আমরা বুধবার তাদের জানিয়েছি। এরপর শনিবার সারাদিন তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছি। তারা বলেছেন, তারা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে মৌখিকভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন।’
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বাখরাবাদ ও সালদা গ্যাস ফিল্ড একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলে। তাই আমি তাদের বিস্তারিত লিখে জানাতে বলেছি। আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে বিস্তারিত জানাব।’
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে সালদা গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়। ১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে তিনটি কূপ থেকে গড়ে সাড়ে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- গ্যাস
- চুরির অভিযোগ