ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ভিন্ন পেশাজীবীরা কৃষক-কিষানি তালিকায়, টাকা আত্মসাৎ

ভিন্ন পেশাজীবীরা কৃষক-কিষানি তালিকায়, টাকা আত্মসাৎ
×
×

ছবি: সমকাল

 ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১১ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কবিতা খানমের (২৪) স্বামী আতিক উল্লাহ শুঁটকি ব্যবসায়ী। পেশায় এই নারী গৃহিণী হলেও খাদ্য বিভাগে কক্সবাজার সদর উপজেলা কার্যালয়ের পাঠানো তালিকায় তাঁকে দেখানো হয়েছে কিষানি হিসেবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কবিতার কাছ থেকে তিন টন ধান কেনার দাম হিসেবে তাঁর নামে এক লাখ আট হাজার টাকাও দেওয়া হয়েছে। টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিধান বড়ুয়া।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা কবিতা খানম কখনও কিষানি ছিলেন না। কবিতাও স্বীকার করেন, তাঁর স্বামী আতিক বা পরিবারের কেউ কৃষিকাজে জড়িত নন। তাঁর ভাষ্য, সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামরুল হাসান সিদ্দিকী তাঁকে কিষানি সাজিয়ে এক লাখ আট হাজার সরকারি ধান ক্রয়ের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিনিময়ে তাঁকে এক হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ধান বিক্রির জন্য তিনি কখনও খাদ্যগুদামেও যাননি।

এভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সংঘবদ্ধ চক্রে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার পাশাপাশি খাদ্যগুদাম ও ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক সমকালকে জানিয়েছেন, খাদ্য গুদামে নানা ধরনের সরকারি চাল ও ধান থাকে। গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এক প্রকল্পের ধান-চাল অন্য প্রকল্পে দেখিয়ে দেন। তাই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।

কমিশনের টাকায় বনিবনা না হওয়ায় পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের নাম তালিকায় তোলেননি কৃষি কর্মকর্তা কামরুল হাসান সিদ্দিকী। অথচ জেলে নুরুল ইসলামের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার ফরমও পূরণ করা হয়েছিল। এই ব্যক্তির ভাষ্য, কামরুল হাসান সিদ্দিকী তাঁকে এক হাজার টাকার বিনিময়ে ব্যাংক থেকে এক লাখ আট হাজার টাকা তুলে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি (নুরুল) কামরুলের কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে দুজনের তর্কাতর্কি হয়। পরে আর ব্যাংক হিসাবও খোলা হয়নি।

শুরুতে উল্লেখ করা গৃহিণী কবিতা খানমের দেওয়া তথ্যমতে, কৃষি কর্মকর্তা কামরুল হাসান সিদ্দিকী প্রথমে কৃষি ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য একটা ফরম পূরণ করে নিয়ে যায়। পরে নানা সহায়তার কথা বলে গত ৪ আগস্ট ব্যাংকে নিয়ে তাঁর হাতে একটা চেক দিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড় করিয়ে দেন। এ সময় এক লাখ আট হাজার টাকা তোলার সঙ্গে সঙ্গে কবিতার কাছ থেকে নিয়ে 
যান কামরুল হাসান। বিনিময়ে এক হাজার টাকা দেন তিনি।

একইভাবে কবিতার মা আনজুমান আরা বেগমকেও কিষানি সাজিয়ে সরকারি ধান কেনার নামে এক লাখ আট হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কামরুল হাসান। তাদের মতো শতশত নারী-পুরুষকে কৃষক-কিষানি সাজিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের সরকারি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুটি অভিযোগ অস্বীকার করেন সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামরুল হাসান সিদ্দিকী। তাঁর দাবি, ‘এক ব্যক্তির অনুরোধে কুতুবদিয়া পাড়ার ওই নারীদের ব্যাংক হিসাবের ফরম পৌঁছে দিয়েছি। আর কোনো কাজে জড়িত নই।’

কক্সবাজার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবু কাউছারের দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজারে চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার ৪০৬ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৩১ টন। যা লক্ষ্যমাত্রার ৪২৫ টন বেশি। গত ৩ মে থেকে শুরু হওয়া সংগ্রহ চলে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। চলতি মৌসুমে সরকার ধান ৩৬ টাকা, আতপ ৪৮ টাকা ও সেদ্ধ চালের দর ৪৯ টাকা নির্ধারণ করে। আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৩৭ টন, সংগ্রহ হয়েছে তিন হাজার ৭৫৪ টন। সেদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে চার হাজার ১৬০ টন।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল রানার ভাষ্য, কৃষকের তালিকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা করে থাকেন। এমন কোনো অভিযোগ থাকলে তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে।

চেক আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক থেকে কৃষকদের টাকা দিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান কৃষি ব্যাংকের কক্সবাজার শাখার ব্যবস্থাপক সাখাওয়াত আলী। তিনি বলেন, ‘কোনো কৃষক ১০ টাকার হিসাব খুলতে চাইলে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে থাকি। কিন্তু কবিতা খানম নামের ওই নারী ব্যাংকে এসেছিলেন কিনা– এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, অন্য পেশাজীবীকে কৃষক সাজিয়ে ধান সংগ্রহের টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি গুরুতর। এতে প্রকৃত কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, সরকারের মহৎ উদ্যোগ বিফলে যাচ্ছে। তাই বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তিনি।

কক্সবাজার সদর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিধান বড়ুয়ার দেওয়া তথ্যমতে, সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে ৪৪৬ জন কৃষকের একটি তালিকা পাঠানো হয়। তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। কবিতা খানমের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক নারী মুখে নেকাব পড়ে আসেন। আবার অনেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে ধান বিক্রি করতে আসেন। তখন ধান না নিলে অনেকে অভিযোগ করেন, তাই নিয়ে নিই।’

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের ভাষ্য, অন্য পেশাজীবীদের কৃষক-কিষানি সাজিয়ে সরকারি ধান ক্রয়ের টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×