ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রশাসনের মামলা, নাম নেই অভিযুক্তদের

ছাত্রদলের তিন নেতা বহিষ্কার, ছয়জনকে কারণ দর্শাও

প্রশাসনের মামলা, নাম নেই অভিযুক্তদের
×

 রাজশাহী ব্যুরো ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গতকাল সোমবার মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এজাহারে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের নাম নেই। এদিকে মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তিন নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনের আরও ছয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।  

গতকাল রাত ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কার ও কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়।
বহিষ্কৃতরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম হাসিব ও বিশাল চক্রবর্তী। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাদের সংগঠনের সাংগঠনিক পদ এবং ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কারণ দর্শাও নোটিশ পাওয়া ছয়জন হলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, সহসভাপতি বুলবুল রহমান, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহসভাপতি ফারুক হোসেন, সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম এবং ছাত্রনেতা সৈয়দ সাজহারুল।

ঘটনার তদন্তে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম-২-কে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম, অধ্যাপক এম আসাদুল হক, অধ্যাপক আনিছুর রহমান এবং কাজী মামুন হায়দার।
ঘটনার তদন্তে গতকাল কেন্দ্রীয় ছাত্রদলও দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। 

অভিযুক্ত যারা
একাধিক ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হামলার ঘটনায় চিহ্নিতদের মধ্যে রয়েছেন আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহসান হাবীব, ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম, আইবিএর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাকবীর আহমেদ ইমন, সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম অথি এবং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম। অথি ও সাজহারুল বাদে অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত শিক্ষার্থী। 

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থীকে মারধর ও ছুরিকাঘাতের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক সদস্যের সঙ্গে হাসিবুল ও আহসান হাবিবের চাঁদাবাজির ফোনালাপ ফাঁস হয়। এ ঘটনার পর ছাত্রদল তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে। পরে ২০২৫ সালের জুনে এক শিক্ষার্থীকে আটকে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে হাসিবুলের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া গত এপ্রিলে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে আবুল হাসান নামে এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত ও মারধরের অভিযোগ ওঠে হাসিবুলের বিরুদ্ধে।

ছাত্রদলের আগের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন আহসান হাবীব। তাঁর বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, আহসান হাবীবসহ কয়েকজন তাঁর পথরোধ করে দুই হাজার টাকা দাবি করেন এবং মারধর করে দেড় হাজার টাকা দিতে বাধ্য করেন। 

ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আহসান হাবীব ও হাসিবুলের সঙ্গে তাঁকেও ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। তাকবীর আহমেদ ইমনের বিরুদ্ধেও একই ঘটনায় টাকা আদায়ে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। পরে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ, আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি, কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’

ঘটনার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশীদ। এ সময় ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রশাসনের কাছে তিনি দাবি তুলে ধরে রাত ২টা পর্যন্ত হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষেই অবস্থান নেন। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। হল প্রশাসন মামলা করেছে। মামলায় অভিযুক্তদের নাম না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযুক্তরা ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মামলায় সংগঠনের পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। 

সিসিটিভি ফুটেজ ‘গায়েব’
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল নেতাকর্মী ও হল প্রাধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। গতকাল হামলার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় হল প্রশাসন। অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুবুর রহমান বলেন, সংস্কার কাজ চলমান থাকায় তখন সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। সে জন্য ফুটেজ নেই। 
বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদ
সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকালে বিভাগে তারা একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আল মামুন বলেন, ‘আমাদের দাবি পরিষ্কার— যারা সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত শাস্তির উপযুক্ত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।’

যা বলছে ছাত্রদল ও প্রশাসন
ছাত্রদলের কমিটির সদস্যরা হলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ও মনজুরুল আলম রিয়াদ। মনজুরুল আলম রিয়াদ সমকালকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা ফুটেজ ও নিউজ বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি পর্যবেক্ষণ সভাপতি-সম্পাদককে জানিয়েছি।’

এ বিষয়ে মতিহার থানার ওসি শামসুল আলমকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরলেও কথা বলেননি। এক পর্যায়ে সংযোগ কেটে দেন। পরে নগর পুলিশের মুখপাত্র গাজীউর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, অজ্ঞাতনামা কয়েকজন শিক্ষার্থীর নামে মামলা হয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাক আহমেদ মামলার তদন্ত করবেন।

আরও পড়ুন

×