সেন্টমার্টিনে খতনার পর ৫০ শিশুর ইনফেকশন-রক্তক্ষরণ, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ
ছবি: সমকাল
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:৫২
কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিনে বিনামূল্যে সুন্নতে খতনা করানোর দুই দিনের মধ্যে অন্তত ৫০ শিশুর ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব শিশুকে নিয়ে স্বজনেরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ হাসপাতালে ছুটে যান। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় টেকনাফে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় দ্বীপজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী কয়েক পরিবারের অভিযোগ, খতনা করানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সতর্কতা যথাযথভাবে মানা হয়নি। তবে শিশুদের ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণের সুনির্দিষ্ট কারণ চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গত ৪ অক্টোবর সেন্টমার্টিন অবকাশ রিসোর্টে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সুন্নতে খতনা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম ওই কর্মসূচিতে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২১০ শিশুর খতনা করে। পরে শিশুদের বিনামূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়।
সেন্টমার্টিন হাসপাতাল সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খতনা করানো ৫০ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে আসে। তাদের মধ্যে মো. ফয়সাল ও আইনুল ইসলাম নামের দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের টেকনাফে রেফার করা হয়েছে।
সেন্টমার্টিন হাসপাতালের উপসহকারী কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খতনা করানো ৫০ শিশু চিকিৎসা নিতে এসেছে। অনেকের ইনফেকশন হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। দুজন শিশুর অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় তাদের টেকনাফে রেফার করা হয়েছে।’
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, খতনা করানোর পর থেকেই কোনো কোনো শিশুর ক্ষতস্থানে ব্যথা, ফুলে যাওয়া ও পুঁজ দেখা দেয়। পরে কারও কারও ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তারা হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
দ্বীপের বাসিন্দা কবির আহমেদ তার ৯ বছর বয়সী ছেলে আইনুল ইসলামকে ওই কর্মসূচিতে খতনা করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুই দিন আগে একটি মেডিকেল টিমের কাছে আমার ছেলেকে খতনা করিয়েছিলাম। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ওষুধও দিয়েছি। এরপর ছেলের এমন অবস্থা দেখে খুব চিন্তিত। ধারণা করছি, হয়তো ভুল চিকিৎসা হয়েছে। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে টেকনাফে রেফার করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ট্রলার না পাওয়ায় ছেলেকে টেকনাফে নিতে পারছি না।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, একটি মেডিকেল টিম বিনামূল্যে ২১০ শিশুর খতনা করেছে। দুই দিন পর কিছু শিশুর রক্তক্ষরণ দেখা দিয়েছে এবং তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে কী কারণে এমন হয়েছে, তা জানা নেই।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এনামুল হক বলেন, সেন্টমার্টিনে একটি মেডিকেল টিম দুই শতাধিক শিশুর খতনা করেছে। এর মধ্যে ৫০ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে ওই মেডিকেল টিমের দ্বীপে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনার বিষয়ে তাদের কেউ অবগত করেননি।
খতনা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও শিক্ষক আয়াছ উদ্দিন কাজল বলেন, ‘খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশু রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ, দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারই অসচ্ছল। কোনো শিশুর বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিলে তাদের উন্নত চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শিশুদের অসুস্থতার কারণ কী এবং চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, খতনা করানোর পর বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল টিমের গাফিলতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- সেন্টমার্টিন
- চিকিৎসা
- শিশু