চট্টগ্রাম কারাগারে আট মাসে সাড়ে ১০ হাজার ইয়াবা জব্দ
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে চলছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। গত আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে কারাগারে জব্দ করা হয়েছে ১০ হাজার ৪৯৬ পিস ইয়াবা। হাতেনাতে ধরা পড়েছেন দুই নারীসহ ২৬ বন্দি ও এক কারারক্ষী। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ২২টি মামলা। ওই কারারক্ষীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠছে, মাদক চক্রকে সহযোগিতা করছেন কারারক্ষীদের কেউ কেউ। আদালতে হাজিরা দিয়ে কারাগারে ফেরার সময় গেটে আসামিদের শরীর ও ব্যাগ নামমাত্র তল্লাশি করে কারাগারে ইয়াবা ঢোকার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে কারাগারের তল্লাশি টিমকে সরিয়ে গত আগস্টে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকার ১৫ সদস্যের বিশেষ তল্লাশি টিমকে।
জানা গেছে, এক পিস ইয়াবা বাইরে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও কারা অভ্যন্তরে তা ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। গত জুনে কারাগারে মাদক ব্যবসা নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দেওয়ার পর কারা অধিদপ্তর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে তল্লাশি টিম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে বন্দিদের ব্যাগ পরীক্ষার স্ক্যানার মেশিন সাত বছর ধরে অকেজো হয়ে আছে কারা ফটকে। কর্তৃপক্ষ বলছে, নষ্ট হওয়া যন্ত্রাংশ নতুন কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এটি মেরামত হচ্ছে না। বন্দিদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া কাপড়, খাবারের ব্যাগ হাত দিয়েই সনাতন পদ্ধতিতে তল্লাশি করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে কারাগারে ফেরা আসামিদের ফটকে কারারক্ষীরা হাত দিয়ে শরীর তল্লাশি করেন। যেসব আসামির সঙ্গে সখ্য থাকে, তাদের লোক দেখানো তল্লাশি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে সহজেই কারাগারে ইয়াবাসহ অবৈধ সামগ্রী নেওয়া যায়; এমন তথ্য উঠে আসে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। গত দুই মাস ধরে কারাগারের প্রধান ফটকে তল্লাশি করছেন ঢাকা থেকে যাওয়া টিমের সদস্যরা। আদালত থেকে কারাগারে আনা নতুন আসামিদের প্রত্যেককে লুঙ্গি পরিয়ে পুরো শরীর নিখুঁতভাবে তল্লাশি করা হয়। কারও কাছে ইয়াবা পেলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এখন কারা ফটক দিয়ে ইয়াবার প্রবেশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন বন্দিরা।
কারারক্ষী সাময়িক বরখাস্ত
গত জানুয়ারি মাসে কারারক্ষী তৌকির হাসানের কাছে ২৪৫ পিস ইয়াবা পাওয়ার পর তাঁকে নগরের কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। সহকারী প্রধান কারারক্ষী ওসমান গনি বাদী হয়ে ১৯ জানুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০ জানুয়ারি থানা থেকে আদালতে তোলা হলে তৌকিরকে কারাগারে পাঠানো হয়। এদিনই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ১৯ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
অকেজো লাগেজ স্ক্যানার মেশিন
আসামিদের মালপত্র পরীক্ষা করতে ২০১৭ সালের আগস্টে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে লাগেজ স্ক্যানার বসানো হয়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই এটি নষ্ট হয়ে যায়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একবার মেরামত করলেও ২০১৯ সালের এপ্রিলে আবার নষ্ট হয় বলে জানান সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন। সেই থেকে এটি অকেজো।
যত কৌশলে কারাগারে নেওয়া হয় ইয়াবা
চট্টগ্রাম কারাগারে সাত হাজার বন্দির মধ্যে দুই হাজার মাদক মামলার আসামি। তারা কারাগার থেকে আদালতে যান খালি হাতে। হাজিরা দিয়ে কারাগারে ফেরার সময় কেউ কেউ কলার ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে তা গিলে, কেউ মলদ্বারে লুকিয়ে, কেউ জুতায় ঢুকিয়ে, কেউবা শুকনো খাবারের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে ইয়াবা নিয়ে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া ক্রিকেট বল কিংবা প্লাস্টিকের বোতলে ইয়াবা ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দেওয়ালের ওপর দিয়ে কারাগারের ভেতর নির্দিষ্ট স্থানে ছোড়া হয়। বন্দিরা সেগুলো সুবিধাজনক সময়ে কুড়িয়ে নেন।
কারাগারে মাদক বিক্রি দ্বিগুণ দামে
মাদক মামলার আসামি নাজিম বলেন, নানা কৌশলে কারাগারে ইয়াবা নেওয়া হয়। কারাগারে এক পিস ইয়াবা ৬০০ টাকায় বিক্রি করেন। বাইরে তা ৩০০ টাকা। গত ১২ আগস্ট সেতেরা বেগম নামে এক হাজতি পেটে করে ৩২০ পিস ইয়াবা নিয়ে কারাগারে যান। পরে মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে মলত্যাগ করে সেগুলো বের করেন। কারারক্ষী তাঁকে ধরে কারা ফটকে নিয়ে আসেন। তাঁকে এ সংক্রান্ত মামলা দিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়। আরেক আসামি ইসহাক ভুঁইয়া কারাভ্যন্তরে ৪০ পিস ইয়াবা নিয়ে আটক হন। নতুন মামলা দিয়ে তাঁকেও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২১ মে ১ হাজার ২৫০ পিস ইয়াবা নিয়ে কারাফটকে আটক হন হাজতি আসামি হেলাল উদ্দিন ও মো. সাদেক।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কারা ফটকে তল্লাশির সময় আসামিদের মধ্যে কক্সবাজারের সৈয়দ আহমদ ১ হাজার ১০৫ পিস, টেকনাফের আয়াস উদ্দিন ও রুবেল হাওলাদার ৪৩০, নুর বেগম ও এনায়েত উল্লাহ ৫০০, নবী হোসাইন ৮৯৩, মো. আইয়ুব ও মোহাম্মদ ঈসমাইল ১৫০, মো. জুবায়ের ১ হাজার ৪৫০, রুবেল মিয়া ৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া এই সময়ে আরও ১৭ জনকে ইয়াবাসহ ধরা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই টেকনাফের বাসিন্দা।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, শুধু কারা ফটকে নয়; কারাভ্যন্তরে অল্পসংখ্যক ইয়াবা কিংবা গাঁজা নিয়ে প্রতিদিনই কয়েকজন আটক হন। তাদের কারা বিধি অনুযায়ী ডান্ডাবেড়ি পরানোসহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়।
সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, কারারক্ষীদের সঙ্গে বন্দি আসামিদের প্রায় প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়। কেউ কেউ হয়তো স্থানীয়ভাবে পরিচিত। অনেক সময় সর্ম্পকের কারণে স্থানীয় কারারক্ষীরা আসামিদের সঠিকভাবে তল্লাশি করেন না– এমন অভিযোগ ওঠার পর ঢাকার বিশেষ টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটাকে আমাদের ব্যর্থতা বলার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) মো. ছগির মিয়া বলেন, চট্টগ্রাম কারাগারে মাদক ব্যবসা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তল্লাশি টিমে বদল আনা হয়েছে। আগে লুঙ্গি না পরালেও এখন লুঙ্গি পরিয়ে প্রত্যেক আসামিকে কঠোরভাবে তল্লাশি করে ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে।