রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করলেন বিএনপি নেতারা
এক নেতা বললেন, এটাকে মব বলা ঠিক হবে না। এটা ৫ আগস্টের মতো ছোটখাটো আন্দোলন
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিকে ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার অভিযোগ
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি ও কৃষক দলের নেতাকর্মীরা উপাচার্য অফিসে গিয়ে তাদের লিখে নেওয়া পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেন। পরে তাঁকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। উপাচার্যকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাঁর একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকেও মারধর করে পদত্যাগ করানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে বিএনপি ও কৃষক দলের ৪০-৫০ নেতাকর্মী মিছিল করে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। এতে নেতৃত্ব দেন মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম। তাঁর সঙ্গে অন্যদের মধ্যে ছিলেন রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশীদ। দরজায় ধাক্কা দিয়ে তারা উপাচার্য কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। উপাচার্যের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান আব্দুস সালাম ও হারুনুর রশীদ। এ সময় সাগর নামে এক বিএনপিকর্মী আগে থেকে লেখা পদত্যাগপত্র এনে হারুনুর রশীদের হাতে দেন। হারুন ও সালাম উপাচার্যকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।
তখন স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা’ এবং ‘আওয়ামী লীগের ভিসি হুঁশিয়ার, সাবধান’। পরে উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঠিকাদার ও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোক এর আগেও আমার পদত্যাগ দাবিতে মানববন্ধন করেছিল। বিভিন্ন সময় তারা আমার কাছে ঠিকাদারি কাজ চাইত। তাদের দাবি, আমি যেন জোর করে তাদের কাজ পাইয়ে দিই। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় তারা হঠাৎ আমার অফিসে জোর করে ঢুকে যায়। তারা অভিযোগ করে, তাদের কাজ না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারকে দিয়েছি। এ সময় তারা আমাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে লাঞ্ছিত করে। তারা মব সৃষ্টি করে আমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাদের লেখা একটি পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেয়।’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘তারা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে বের করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। জোর করে এভাবে কখনও পদত্যাগ করানো যায় না। কিন্তু অফিসে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। তারা আমার একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকে অবরুদ্ধ করে মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। অফিসের সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক, কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে গেছে। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।’
উপাচার্যের একান্ত সচিব (সেকশন অফিসার অর্থ) নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা আমাকে স্বাক্ষর করায়। এটা কোনো ইস্তফা নয়, অস্ত্রের মুখে এটা করেছে।’
এ বিষয়ে জানতে কৃষক দলের রাজশাহী মহানগর শাখার আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম বলেন, ‘তাঁতী দলের মহানগর সভাপতি কাজল, কৃষক দলের আহ্বায়ক শামীম, জিয়া মঞ্চের মহানগর সভাপতি কামাল, হারুন এবং আমার নেতৃত্বে ভিসিকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। এটার বিষয়ে আমাদের নেতা নজরুল হুদা (মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি) সব জানেন। কিছু জানার থাকলে নজরুল হুদার কাছে জানেন।’
এ বিষয়ে নজরুল হুদা বলেন, ‘এটা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, ছাত্র-জনতার ব্যানারে স্থানীয় বিএনপি ও এলাকাবাসী করেছে। এটা ভিসির কারণেই হয়েছে। ভিসি নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছে। ঠিকাদারি কাজ নিয়েও ঝামেলা করে। এ নিয়ে মানববন্ধন করেছিল। পরে ভিসি পদত্যাগ করেছে শুনলাম।’ এটি ‘মব’ কিনা– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটাকে মব বলা ঠিক হবে না। এটা প্রতিবাদ। জনগণ ব্যানার দিয়ে করেছে, এটা ৫ আগস্টের মতো ছোটখাটো আন্দোলন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যানার দিয়ে কিছু করলে মব বলা যাবে না। ৫ আগস্টও এভাবেই হয়েছে।’
জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি। কারা করেছে, তা জানা নাই।’ নগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। এটা বিএনপির দলীয় কোনো সিদ্ধান্তে হয়নি। বিএনপি মবের বিপক্ষে। এ ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
- মব
- পদত্যাগ