টিপসই নিয়ে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ, বুয়েট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শতবর্ষী মায়ের মামলা
রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা রেফুল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৫২
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমি-সংক্রান্ত মামলার কথা বলে টিপসই নিয়ে বাবা-মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বসতভিটা রক্ষা ও সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে শতবর্ষী মা আদালতে মামলা করেছেন।
অভিযুক্ত মো. মুখতারুজ্জামান বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার। তাঁর মা রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা রেফুল (১০০) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা মাঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী মৃত এসলাম হোসেন। সাত সন্তানের মধ্যে মুখতারুজ্জামান দ্বিতীয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে বসবাস করছেন রহিমা খাতুন। জরাজীর্ণ ওই বাড়ির টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। ঘুনে চালের অংশও খসে পড়ছে। এমন অবস্থায় বাড়িটি মেরামত করতে গেলেও মুখতারুজ্জামান বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর মা ও ছোট ভাই।
রহিমা খাতুনের অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত একটি মামলা পরিচালনার কথা বলে তাঁর ও প্রয়াত স্বামীর কাছ থেকে কৌশলে টিপসই নেন মুখতারুজ্জামান। পরে ওই টিপসই ব্যবহার করে বাবা-মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন তিনি। বিষয়টি জানার পর প্রতিকার চেয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ ও থানায় অভিযোগ করেন তিনি। জেলা লিগ্যাল এইডেও বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তাঁর।
শতবর্ষী রহিমা খাতুন বলেন, ‘জমি সংক্রান্ত মামলা চলছে বলে টিপসই নিয়েছিল আমার ছেলে। পরে জানতে পারি, আমার ও আমার স্বামীর জমি তার নামে লিখে নিয়েছে। এখন আমাকে ও ছোট ছেলে ইসমাইলকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিইনি। শেষ বয়সে নিজের বসতভিটাটুকু নিয়ে আমি আদালতে যেতে বাধ্য হয়েছি।’
রহিমা খাতুনের ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁদের বাবা-মায়ের প্রায় ১২ বিঘা ধান ও আমের জমি এবং বসতবাড়ি রয়েছে। এসব সম্পত্তি মুখতারুজ্জামানের নামে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সামান্য আয় করি। মাকে দেখাশোনা করছি। বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মেরামতের চেষ্টা করলেও ভাই করতে দিচ্ছেন না। উল্টো বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।’
অন্য দুই ছেলে আলিম হোসেন ও খাইরুল হোসেনও একই অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, সাত ভাই-বোনের মধ্যে বাকি ছয়জনকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বাবা-মাকে ভুল বুঝিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার পরও মুখতারুজ্জামান তাঁদের মায়ের খোঁজখবর রাখছেন না।
বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল হক কমল বলেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ হয়েছে। সালিশে বিষয়টি সমাধানের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হলেও অভিযুক্ত তা মানেননি। তিনি বলেন, ‘দলিলপত্র দেখে মনে হয়েছে, আইনগতভাবে তাঁর পিতার সম্পত্তির মালিক এখন তিনি। তবে প্রতারণা করে বা যেভাবেই হোক সম্পত্তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সালিশে তাঁর মা বারবার বলেছেন, তিনি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেননি।’
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে মুখতারুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কয়েকদিনের চেষ্টায় তাঁর তিনটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা গেলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। পরে নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. সোহরাব আলী মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট একটি মামলা দায়ের করেছেন মোছা. রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা ওরফে রেফুল। সেখানে আসামি করা হয়েছে তারই মেজো ছেলে মুখতারুজ্জামানকে। মামলার মুল বিষয়বস্তু হলো, মো. মুখতারুজ্জামান তার বাবাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে যান এবং টিপসই দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন। পরে কৌশলে মায়ের কাছ থেকেও টিপসই নিয়ে সম্পত্তি লিখে নেন।’ তবে বিস্তারিত জানতে হলে তিনি তার চেম্বারে সন্ধ্যার পরে দেখা করার পরামর্শ দেন।
- বিষয় :
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ
- মামলা
- বুয়েট