ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে মাঠ কর্মকর্তারা, সংকট টাকার

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে মাঠ কর্মকর্তারা, সংকট টাকার
×
×

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ রাখতে গতকাল বুধবার মধ্যরাতে শুরু হয়েছে ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরের ইলিশ আহরণের মৌসুম শেষ হয়েছে। এবার শেষ দিন পর্যন্ত নদী-সাগরে ইলিশের সংকট চলেছে। মা ইলিশের নিরাপত্তায় নিষেধাজ্ঞা নদীতে কার্যকর করতে অর্থ সংকট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে এবার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারাদেশে আহরিত ইলিশের ৭০ ভাগ মেলে দক্ষিণাঞ্চলের সাগর ও নদীতে। বছরে আহরিত মোট ইলিশের দুই-তৃতীয়াশ পাওয়া বর্ষাকালের তিন মাসে। এই সময় ইলিশের ভরা মৌসুম, যা জুলাইয়ে শুরু হয়ে চলে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত। ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে মেঘনা, এর শাখা তেতুলিয়া ও কালাবদরসহ বরিশাল ও ভোলা জেলাকে ঘিরে রাখা কয়েকটি নদীর পরিচিতি। এসব কারণে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ওপর ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি নির্ভর করছে।

ক্রমাগত কমছে ইলিশ
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, দুই বছর আগে ভরা মৌসুমের তিন মাসে যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়েছিল, এবার তার চেয়ে ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ কম আহরণ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে কমেছে ১৩ দশমিক শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বরিশাল বিভাগে মোট ইলিশ আহরণ হয়েছে ৬৫ হাজার ৩৪৪ দশমিক ৯৮৬ টন। গত বছরের এই তিন মাসে যা ছিল ৭৫ হাজার ৬৩১ দশমিক ০৫ টন। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল এক লাখ তিন হাজার ৬৪৭ টন। সে হিসাবে গত বছরের চেয়ে এবার ১০ হাজার ২৮৬ দশমিক ০৬৪ টন কম ইলিশ আহরণ হয়েছে। ২০২৪ সালের চেয়ে যা কম ৩৮ হাজার ৩০২ দশমিক ২৩৪ টন।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভরা মৌসুমের তিন মাসের মধ্যে বেশি ইলিশ পাওয়া যায় সেপ্টেম্বরে। আহরণের হিসাব ঘেঁটে দেখা গেছে, এবারের তিন মাসে আহরণ করা ৬৫ হাজার ৩৪৪ টন ইলিশের মধ্যে ৪১ হাজার ৪৫১ দশমিক ৪১৯ টন আহরণ হয়েছে সেপ্টেম্বরে, যা দু্‌ই-তৃতীয়াংশ। যে কারণে গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহগুলোতে মোকামে ইলিশের সরবরাহ ছিল বেশি। এতে প্রতি কেজিতে দাম কমেছিল ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত।

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য আড়তদার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ মোকামে ইলিশ এসেছে এক হাজার ২৮০ মণ। সে হিসাবে দিনে গড়ে এসেছে ১৬০ মণ ইলিশ। এর আগের সপ্তাহে গড়ে এসেছে ৭৫ মণ।
অক্টোবরের শুরুতে ইলিশের সরবরাহ কমতে থাকে। যার ফলে দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। পোর্ট রোড মোকামের আড়তদার মো. নাসির উদ্দিন জানালেন, গতকাল বুধবার মৌসুমের শেষ দিনে মোকামে প্রায় ১০০ মণ ইলিশ এসেছে। খুচরা বিক্রেতারা জাটকা (ছয়টিতে এক কেজি) বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ৭০০-৮০০ টাকায়। ৫০০ গ্রাম আকারের ইলিশের কেজি ছিল অন্তত দেড় হাজার টাকা। ৬০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ এদিন প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২২০০-২৫০০ টাকায়।

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জ
প্রতিবছর আশ্বিনের পূর্ণিমা মাঝে রেখে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ২০২৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০ ভাগ ইলিশের পেটে এই সময়ে ডিম আসে। মাছগুলো প্রজননের জন্য তখন সাগর থেকে মিঠাপানিতে ছুটে আসে। মেঘনা ও এর শাখা নদীগুলো ইলিশের প্রজননক্ষেত্র। সাগর থেকে নদীতে ছুটে আসা ও প্রজননের আগে নিধন থেকে রক্ষা করতে ২২ দিন নদীতে জেলেদের নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২০২০ সালে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ কার্যক্রম শুরুর পর ইলিশ রক্ষা সংশ্লিষ্ট সব কর্মসূচির খরচ একটি প্রকল্প থেকে দেওয়া হতো। গত জুনে এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতার জন্য শোভাযাত্রা-সমাবেশ, অভিযান পরিচালনায় গাড়ি, স্পিডবোট, অন্যান্য নৌযানের জ্বালানি এবং অন্যান্য কারিগরি কাজ ও লোকবলের জন্য বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় এবার কমেছে।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আগে ইলিশ সম্পদ রক্ষা প্রকল্প থেকে স্পিডবোট, ট্রলারের তেল খরচসহ অভিযানের প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যেত। এবার সেই বরাদ্দ প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। অসাধু জেলেদের ইলিশ নিধন ঠেকাতে নদীতে পর্যাপ্ত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন তারা।
বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. জামাল হোসাইন অর্থ সংকটের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ইলিশ বিচরণের নদীঘেঁষা যেসব উপজেলা রয়েছে, সেসব উপজেলার জন্য সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। অন্যান্য উপজেলার বরাদ্দ ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে। যেমন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় বরাদ্দ হয়েছে ৭০ হাজার টাকা।
অর্থ সংকটে কি সমস্যায় পড়তে হবে জানতে চাইলে জামাল হোসাইন বলেন, তীর থেকে কাছাকাছি এলাকার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা অভিযানে স্পিডবোটে জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচ হয় ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। গভীর মেঘনায় পৌঁছাতে খরচ আরও বেশি। এ হিসাবে দুই লাখ টাকায় সর্বাধিক আটটি অভিযান চালানো যাবে। প্রতিদিন এটি করে অভিযান চালালে আট দিনে আটটি অভিযান হবে। বাকি ১৪ দিনে অভিযানের খরচ কীভাবে আসবে, এ নিয়ে চিন্তায় আছেন।
 

আরও পড়ুন

×