সম্পর্কের টানাপোড়েনে বাড়ছে আত্মহত্যা
মো. আশিকুর রহমান, লালপুর (নাটোর)
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইমাম আলী এখন আর আগের মতো কাজে যান না। মুখে হাসিও নেই। ছয় দিন আগেও যে মানুষটি দিনমজুরি করে সংসার চালাতে ছুটে বেড়াতেন, এখন তাঁর দিন কাটে স্ত্রীর স্মৃতি আঁকড়ে। নাটোরের লালপুর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের ইমামের জীবনে এই বদল এসেছে স্ত্রী রওশনারা বেগমের মৃত্যুর পর। গত ৮ সেপ্টেম্বর রওশনারা বেগম (৪০) আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক কলহের জেরে তাঁর এমন পরিণতি হয়েছে বলে স্বজনদের ভাষ্য।
একই উপজেলার বড়বড়িয়া কগ্রামের আরেক হতভাগ্য বাবা গোলাম জাকারিয়ারও দিন কাটছে সন্তান হারানোর শোকে। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন জাকারিয়া। প্রথম পক্ষের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে নূপুর খাতুনকে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাসন করতেন সৎ মা। গত ২ মে রাতেও কথাকাটাকাটি হয় দুজনের মধ্যে। পরদিন সকালে বাবা কাজে এবং সৎ মা বাইরে গেলে, অভিমানী নূপুর নিজ ঘরের সিলিংয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে জীবনের ইতি টানে। মেয়েকে অকালে হারিয়ে কান্না থামছে না বাবার।
শুধু রওশনারা বা নূপুর নন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, দাম্পত্য কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, হতাশা ও নানা সামাজিক সংকটে লালপুরে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি মাঝবয়সীরাও বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ।
লালপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ২০২২ সালে ৩১ জন এবং ২০২৩ সালে ৩৮ জন আত্মহত্যা করেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ জনে, যার মধ্যে ২৮ জন পুরুষ এবং ২০ জন নারী ছিলেন। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা আরও বেড়ে পেয়ে ৫১ জনে পৌঁছায়; যেখানে নারীর সংখ্যা ছিল ২৮ এবং পুরুষ ২৩ জন। চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ মাসে লালপুরে ৩৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ১৫ জন নারী এবং ২৪ জন পুরুষ রয়েছেন। এমনকি গত ২০ দিনের ব্যবধানেও নতুন করে দুইজনের আত্মহত্যার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে উপজেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী কিশোরী থেকে শুরু করে ৮০ বছরের প্রবীণ হলেও বড় একটি অংশ ১৩ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ ও কর্মক্ষম নারী-পুরুষ। পুলিশ জানায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতির সূত্র ধরে লালপুরে বাড়ছে আত্মহত্যা।
লালপুরে আত্মহত্যার এই পরিসংখ্যান বলছে, সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রয়োজন ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত মানসিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। কারণ পরিবারে একজনের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের সমাপ্তি নয়; তার সঙ্গে থেমে যায় আরও কয়েকটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন। ইমাম আলীর মতো স্বজনদের মুখের হাসি ফিরিয়ে আনতে তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্যোগকে শুধু প্রচারণায় নয়, পরিবার ও সমাজের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ করে তোলা প্রয়োজন।
লালপুর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বেকারত্ব, হতাশা, দাম্পত্য কলহ ও প্রেমে প্রত্যাখ্যানের মতো বিষয় আত্মহত্যার ঘটনায় ভূমিকা রাখছে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে তা ঘটছে। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীর মধ্যে এমন প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ওসি আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠনসহ সমাজের সব পর্যায়ের মানুষকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ড. এনামুল হকের মতে, পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই হতাশা থেকে অনেক সময় আত্মহত্যার চিন্তা আসে। প্রেমে ব্যর্থতা, দাম্পত্য সম্পর্কের সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ যখন জীবনের অর্থ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর হতাশায় ভোগে, তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘মানসিক দুর্বলতা’ হিসেবে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
ড. এনামুল হক বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ– তিন পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবারে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি ব্যক্তির মতামত ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য গঠনমূলক কার্যক্রম বাড়ানো দরকার।
লালপুরে আত্মহত্যার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এ প্রবণতা ঠেকাতে উপজেলা পর্যায়ে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিয়মিত কোনো বিশেষ কর্মসূচি, কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চোখে পড়ছে না।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবির হোসেন বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু রয়েছে।
- বিষয় :
- আত্মহত্যা